বাংলাদেশে (Bangladesh) সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর চাপ ও হয়রানির অভিযোগ নতুন নয়। তবে মাদারীপুর জেলার লোকনাথ (লোকহোন্ডা) হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক যুগল তালুকদারকে গ্রেফতারের ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ বা যাচাই ছাড়াই তাঁকে নিষিদ্ধ আওয়ামি লীগের সঙ্গে যুক্ত থাকার সন্দেহে গ্রেফতার করেছে প্রশাসন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন পড়ুয়া, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা। স্কুল চত্বরে দেখা গিয়েছে নজিরবিহীন ছাত্র আন্দোলন।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মাদারীপুর জেলার একাধিক এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে আওয়ামি লীগ ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় শুরু হয়েছে। সেই তালিকাতেই উঠে আসে হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষক যুগল তালুকদারের নাম। অভিযোগ, তিনি নাকি অতীতে আওয়ামি লীগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। যদিও এই দাবির পক্ষে কোনও লিখিত নথি, রাজনৈতিক পদ বা প্রকাশ্য কার্যকলাপের প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
এরপরই তাঁকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই খবরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ক্ষোভ। লোকহোন্ডা হাইস্কুলের শতাধিক পড়ুয়া ইউনিফর্ম পরে রাস্তায় নেমে আসে। তাদের হাতে ছিল বাংলা ভাষায় লেখা পোস্টার ও ব্যানার—“আমাদের স্যার নির্দোষ”, “যুগল স্যারকে মুক্তি দিন”, “শিক্ষককে রাজনীতির বলি বানাবেন না” ইত্যাদি স্লোগান। অনেক ব্যানারে যুগল তালুকদারের ছবি লাগানো ছিল, যা আন্দোলনের আবেগ ও ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আন্দোলন ছিল সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কোনও ভাঙচুর বা হিংসার ছবি নেই। পড়ুয়াদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় অভিভাবক ও সাধারণ মানুষও। তাঁদের বক্তব্য, যুগল তালুকদার দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে শিক্ষকতা করছেন এবং কখনও রাজনৈতিক প্রচারে যুক্ত ছিলেন না। একজন শিক্ষককে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক সন্দেহের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা অন্যায় ও ভয়াবহ দৃষ্টান্ত বলে দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকে আওয়ামি লীগ-ঘনিষ্ঠ বলে চিহ্নিত বহু মানুষকে টার্গেট করা হচ্ছে। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা বেশি আতঙ্কে রয়েছেন। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠছে, প্রমাণ ছাড়াই গ্রেফতার, চাকরিচ্যুতি বা সামাজিক চাপে ফেলার ঘটনা ঘটছে। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, ধর্ম নয়—শুধুমাত্র আইনভঙ্গই তাদের পদক্ষেপের কারণ।
তবে বাস্তব চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষামহল। তাঁদের বক্তব্য, একজন স্কুলশিক্ষককে গ্রেফতার করার আগে প্রশাসনের আরও দায়িত্বশীল ও স্বচ্ছ হওয়া উচিত ছিল। কারণ শিক্ষক সমাজের উপর এমন আচরণ শিক্ষা ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ছাত্রদের মানসিক অবস্থাও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সোশ্যাল মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে একে “বিদ্বেষের রাজনীতি” বলে আখ্যা দিয়েছেন। কেউ কেউ লিখছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হওয়াটাই যেন অপরাধ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার কেউ দাবি করছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এমন গ্রেফতার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।
যদিও প্রশাসনের তরফে এখনও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় পুলিশ সূত্র শুধু জানিয়েছে, “তদন্তের স্বার্থে” গ্রেফতার করা হয়েছে এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে কবে বা কীভাবে তদন্ত শেষ হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য নেই।
News coming in from #Madaripur district of #Bangladesh.
The Police arrested a Hindu headmaster named Jugal Talukdar without any reason.
The Police alleged that he was associated with the now banned Political Party Awami League.
Against this arrest, locals and the students of… pic.twitter.com/AcBrqsSxgF
— Hindu Voice (@HinduVoice_in) December 31, 2025
এই পরিস্থিতিতে লোকহোন্ডা হাইস্কুলে শিক্ষাদান কার্যত ব্যাহত। ছাত্রছাত্রীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। অনেকেই বলছে, “স্যার না ফিরলে আমরা ক্লাসে ফিরব না।” আন্দোলনের ভাষা শান্ত হলেও তার অন্তর্নিহিত বার্তা অত্যন্ত শক্তিশালী—একজন শিক্ষকের সম্মান ও নিরাপত্তা রক্ষার দাবি।
সার্বিকভাবে এই ঘটনা বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার এক উদ্বেগজনক ছবি তুলে ধরছে। যেখানে রাজনৈতিক সন্দেহ, দলীয় পরিচয় ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু পরিচয় মিলেমিশে সাধারণ নাগরিকের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। যুগল তালুকদারের গ্রেফতার শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর এক ভয়ের পরিবেশের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন বহু পর্যবেক্ষক। এখন দেখার, প্রশাসন ও সরকার এই পরিস্থিতিতে কী অবস্থান নেয় এবং আদৌ কি দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সত্য সামনে আসে কিনা।
