ঘৃণা ছড়ালেও পেট চালাতে বাংলাদেশিদের ভারতই ভরসা

bangladesh-anti-india-sentiment-economic-dependence-illegal-migration

ভারত-বিরোধিতার স্লোগান, বয়কটের ডাক, সামাজিক মাধ্যমে বিদ্বেষের বিস্তার, সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে (Bangladesh) ভারতের বিরুদ্ধে সুর ক্রমশ চড়েছে। ‘বয়কট ভারত’ আন্দোলনের আবহে সরকার বদলের দাবিও উঠেছে নানা মহলে। রাজনীতির ময়দানে ভারতকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক ভাষা, মিছিল-মিটিংয়ে তীব্র বক্তব্য—সবই চোখে পড়ছে। কিন্তু বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে একটি প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে: এত ঘৃণার মধ্যেও রুজিরুটির টানে কেন বারবার ভারতই ভরসা হয়ে উঠছে বাংলাদেশের একাংশের কাছে?

Advertisements

উত্তরটা মিলছে সীমান্তে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর থেকে দক্ষিণ—প্রায় প্রতিদিনই সীমান্তবর্তী এলাকায় ধরা পড়ছেন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরা। নিরাপত্তারক্ষীদের জেরায় অধিকাংশেরই দাবি এক—কাজের খোঁজে ভারতে আসা। কেউ নির্মাণ শ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউ আবার কারখানায় কাজের আশায় সীমান্ত পেরিয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহে উত্তরবঙ্গের একাধিক এলাকায় কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন। তাঁদের গতিবিধি সন্দেহজনক হওয়ায় তল্লাশি চালাতেই অনুপ্রবেশের বিষয়টি সামনে আসে।

   

সোমবার উত্তরবঙ্গের একটি সীমান্ত এলাকা থেকে দুই তরুণীকে আটক করা হয়। জেরায় তাঁরা জানান, রবিবার গভীর রাতে দালালের সাহায্যে সীমান্ত পার করেছেন। লক্ষ্য ছিল কাজ জোগাড় করা—দুবেলা পেটের ভাতের নিশ্চয়তা। তাঁদের বক্তব্যে স্পষ্ট, দেশে কাজের অভাব, মজুরি কম, আর্থিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়েই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা। প্রশাসনের একাংশের মতে, এমন ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং গত কয়েক মাসে কাজের খোঁজে অনুপ্রবেশের প্রবণতা বেড়েছে।

ভারত সরকার ও রাজ্য প্রশাসন অবৈধ অনুপ্রবেশ রুখতে কড়া অবস্থান নিয়েছে। সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে, গ্রেফতার হওয়া অবৈধ বাসিন্দাদের চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াও চলছে। তবু অনুপ্রবেশ থামছে না। বরং সীমান্তের দু’পারের টানাপোড়েন, কাঁটাতারের বেড়া, নদীপথের ঝুঁকি—সব উপেক্ষা করেই একাংশ বাংলাদেশি জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ হিসেবে উঠে আসছে একটাই কথা—রুটি-রুজি।

এই পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয়েছে দালালচক্র। সীমান্তে কড়াকড়ি যত বাড়ছে, দালালদের ‘দর’ ততই চড়ছে। মঙ্গলবার বনগাঁ সীমান্তে এক মহিলাকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর দাবি, দালালকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে ভারতে ঢুকেছেন। উদ্দেশ্য ছিল গুজরাতে গিয়ে কাজ করা। অর্থাৎ অনুপ্রবেশটা ছিল পরিকল্পিত, যোগাযোগ আগেই করা, গন্তব্যও ঠিক। নিরাপত্তা সূত্রের দাবি, এমন ‘পাকাপাকি’ অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যাও কম নয়—যাঁরা একবার ঢুকে পড়লে সহজে ফিরতে চান না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দ্বৈততা—একদিকে ভারত-বিরোধী আবেগ, অন্যদিকে জীবিকার জন্য ভারতের ওপর নির্ভরতা—আসলে অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। রাজনৈতিক বক্তব্যে যতই বিদ্বেষ থাকুক, কাজের বাজার, মজুরির সুযোগ, এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনীতি এখনও বহু বাংলাদেশির কাছে ভারতকে আকর্ষণীয় করে রাখছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে ভাষাগত ও সামাজিক মিল এই যাতায়াতকে আরও সহজ করে তোলে।

তবে এর সামাজিক ও নিরাপত্তাগত প্রভাবও কম নয়। অবৈধ অনুপ্রবেশ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে সীমান্তবর্তী এলাকায় বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে। প্রশাসনের ওপর চাপ বাড়ছে, একই সঙ্গে মানবিক দিকটিও সামনে আসছে—দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মানুষকে কোথায় ঠেলে দিতে পারে, তার বাস্তব উদাহরণ মিলছে প্রতিদিন।

সব মিলিয়ে স্পষ্ট, ঘৃণার রাজনীতি যতই তুঙ্গে থাকুক, পেটের দায়ই শেষ কথা বলে। আর সেই বাস্তবতায়, নানা টানাপোড়েনের মাঝেও বাংলাদেশিদের একাংশের কাছে ভারত এখনও রুজিরুটির আশ্রয়। এই বৈপরীত্যই আজ উপমহাদেশের সীমান্ত রাজনীতির এক কঠিন, জটিল সত্য।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements