
ইউরোপের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিল অস্ট্রিয়ার সংসদের একটি সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত (Austria hijab ban in schools)। দেশজুড়ে প্রাথমিক স্কুলে ১৪ বছরের কম বয়সি ছাত্রীদের হিজাব ও অনুরূপ মাথা ঢাকার পোশাক পরা নিষিদ্ধ করে একটি বিল পাস হয়েছে। ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর এই আইনটি সংসদে গৃহীত হয়। সরকারের দাবি, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং স্কুল শিক্ষাব্যবস্থায় তথাকথিত “সামাজিক একীকরণ” বা সামাজিক সমন্বয়কে আরও শক্তিশালী করা।
অস্ট্রিয়ার শাসক জোটের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষাস্তরে শিশুরা যেন কোনও ধর্মীয় প্রভাব বা সামাজিক চাপের মধ্যে না পড়ে, সেটাই এই আইনের লক্ষ্য। সরকারের তরফে আরও বলা হয়েছে, ছোট বয়সের মেয়েদের ক্ষেত্রে মাথা ঢাকার মতো ধর্মীয় পোশাক অনেক সময় পরিবার বা সমাজের চাপের ফল হতে পারে, যা শিশুদের স্বাধীন বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এই যুক্তিতেই হিজাব নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিরিয়ানির দোকানে ‘পাক-পতাকা’ সন্দেহে গোষ্ঠী সংঘর্ষ! ধৃত শৈলেশ-রফিক
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই আইনকে ঘিরে তীব্র আপত্তি তুলেছে। বিশেষ করে Amnesty International প্রকাশ্যে জানিয়েছে, এই আইন মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তৈরি এবং এর ফলে সমাজে ইসলামবিদ্বেষ বা মুসলিম-বিরোধী মনোভাব আরও বাড়তে পারে।
সংস্থাটির মতে, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের অধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে এই আইনের মাধ্যমে। শিশুদের অধিকার রক্ষার নামে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতীককে নিশানা করা কখনওই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছে তারা।
এই আইন অনুযায়ী, অস্ট্রিয়ার প্রাথমিক স্কুলে পড়ুয়া প্রায় ১২ হাজার ছাত্রী সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে। যদিও সরকার বলছে, এটি কোনও ধর্মের বিরুদ্ধে নয়, বরং সব ধরনের “ধর্মীয়ভাবে প্রভাবিত” মাথা ঢাকার পোশাকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তবু সমালোচকদের বক্তব্য—বাস্তবে এই নিষেধাজ্ঞা মূলত মুসলিম মেয়েদের উপরই প্রভাব ফেলবে।
প্রসঙ্গত, অস্ট্রিয়ায় এর আগেও ২০১৯ সালে অনুরূপ একটি আইন চালু হয়েছিল। তখনও প্রাথমিক স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালে সেই আইন বাতিল করে দেয় দেশের সর্বোচ্চ বিচারালয় Constitutional Court of Austria। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল, ওই আইন ইসলামকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছিল এবং তাই তা সংবিধানবিরোধী। বর্তমান নতুন আইনের ক্ষেত্রে সরকার দাবি করছে, এবার আইনটি আরও “সাধারণ” ভাষায় তৈরি করা হয়েছে, যাতে কোনও একটি ধর্মকে আলাদা করে টার্গেট করা না হয়।
তবু আইনি বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, এই নতুন আইনও আবার আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। সংখ্যালঘু অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে সংবিধানিক জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন মুসলিম সংগঠন ও নাগরিক অধিকার গোষ্ঠী আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিয়েছে।
এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। @MeghUpdates নামের একটি নিউজ অ্যাগ্রিগেটর অ্যাকাউন্ট থেকে খবরটি পোস্ট হওয়ার পর সমর্থন ও বিরোধিতায় বিভক্ত প্রতিক্রিয়া সামনে এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এটি ইউরোপীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ রক্ষার জন্য জরুরি পদক্ষেপ। আবার অন্য অংশ সতর্ক করে বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ ও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ জুড়ে অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় ও জাতীয় সংস্কৃতি নিয়ে যে বিতর্ক চলছে, অস্ট্রিয়ার এই সিদ্ধান্ত তারই প্রতিফলন। একদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি, অন্যদিকে ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন—এই দুইয়ের সংঘাতে আগামী দিনে অস্ট্রিয়ার রাজনীতি ও সমাজে আরও উত্তাপ বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।










