পশ্চিমবঙ্গের শিল্পনীতিতে আবারও ফিরে এসেছে ‘এক হাজার একর’ জমির প্রসঙ্গ। এক দশকেরও বেশি আগে সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানার জন্য প্রায় এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ঝড় উঠেছিল। সেই সময় তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে জমি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিরোধী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দীর্ঘ আন্দোলন, অনশন ও রাজনৈতিক চাপের ফলে শেষ পর্যন্ত সিঙ্গুরে টাটাদের কারখানা হয়নি। ৪০০ একর জমি নিয়ে জটিলতা কাটেনি আজও। সেই ইতিহাসের স্মৃতি এখনও রাজ্যবাসীর মনে তাজা। আর ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই আবার শিল্পের জন্য এক হাজার একর জমি অধিগ্রহণের পরিকল্পনা সামনে আনছে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত রাজ্য সরকার।
তবে এবার প্রেক্ষাপট আলাদা, কৌশলও ভিন্ন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার বারবার বলেছে- “জমি নেব না, জমি কিনব।” সেই নীতির ভিত্তিতেই রাজ্যের দুই প্রান্তে শিল্পায়নের নতুন রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। একদিকে পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর, অন্যদিকে পশ্চিম বর্ধমানের দুর্গাপুর-রূপনারায়ণপুর অঞ্চলে শিল্পপার্ক- দুই ক্ষেত্রেই জমির পরিমাণ এক হাজার একর।
দুর্গাপুরে হিন্দুস্থান কেবলসের জমি
রাজ্য সরকারের শিল্প দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, দুর্গাপুর সংলগ্ন রূপনারায়ণপুরে অবস্থিত হিন্দুস্থান কেবলস লিমিটেডের (Hindustan Cables Ltd.) প্রায় এক হাজার একর জমি কেনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই সংস্থাটি কেন্দ্র সরকারের অধীন একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, যা বহু বছর ধরেই কার্যত বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কারখানার গেট, মরচে ধরা যন্ত্রপাতি ও পরিত্যক্ত ভবন এখন এলাকাটির পরিচিত ছবি।
রাজ্য সরকার এই জমি কেন্দ্র সরকারের কাছ থেকে কিনে সেখানে একটি আধুনিক শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে চায়। ইতিমধ্যেই একাধিক বেসরকারি সংস্থা এই জমিতে শিল্প স্থাপনে আগ্রহ দেখিয়েছে বলে নবান্ন সূত্রে খবর। ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রাংশ, কেবল উৎপাদন, এমনকি সবুজ শক্তি ও ইভি (ইলেকট্রিক ভেহিকল) সংক্রান্ত শিল্প স্থাপনের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি মহলের দাবি, দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের পরিকাঠামো, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ সুবিধা এই প্রকল্পের পক্ষে বড় প্লাস পয়েন্ট। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা হিন্দুস্থান কেবলসের জমি নতুন করে শিল্পায়িত হলে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা।
The pre-bid meeting for Bengal’s Tajpur deep sea port took place last week, while bid submission starts on the 1st of February.
Adani Group may again participate in the Tajpur RFP, with JSW Infrastructure also in the mix.
1000 acres of land, 99 years of lease.
One week to go⏳ pic.twitter.com/7VYSLSVvHy
— The West Bengal Index (@TheBengalIndex) January 24, 2026
তাজপুর গভীর সমুদ্র বন্দর: আরেক ‘এক হাজার একর’
অন্যদিকে রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে, পূর্ব মেদিনীপুরের তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দরের জন্যও বরাদ্দ থাকছে এক হাজার একর জমি। সম্প্রতি এই প্রকল্পের প্রি-বিড মিটিং সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিড জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প ৯৯ বছরের ডিবিএফওটি (DBFOT) লিজ মডেলে বাস্তবায়িত হবে।
সূত্রের খবর, আদানি গ্রুপ আবারও এই প্রকল্পে অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি জেএসডব্লিউ ইনফ্রাস্ট্রাকচারও দৌড়ে রয়েছে। ২০২২ সালে আদানি গ্রুপকে প্রাথমিকভাবে কাজ দেওয়া হলেও নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া বাতিল হয়। ডিসেম্বর ২০২৫-এ নতুন করে প্রকল্পটি রিভাইভ করা হয়।
তাজপুর বন্দর সম্পূর্ণ হলে বছরে প্রায় ১০ কোটি টন পণ্য পরিবহণের ক্ষমতা তৈরি হতে পারে বলে অনুমান। হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরের সঙ্গে রেল ও সড়কপথে সংযোগ তৈরি করে পূর্ব ভারতের সামুদ্রিক বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়াই লক্ষ্য।
আশাবাদ ও সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া
দুর্গাপুর ও তাজপুর- দুই প্রকল্প নিয়েই জনমত দ্বিধাবিভক্ত। একাংশের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিল্পে পিছিয়ে থাকা পশ্চিমবঙ্গের জন্য এই উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসংস্থান বাড়বে, রাজ্যের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি পাবে এবং শিল্পবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরি হবে।
অন্যদিকে সমালোচকরাও কম নন। তাঁদের প্রশ্ন, গত ১৫ বছরে রাজ্যে বড় শিল্প প্রকল্পের বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়েছে? দুর্গাপুরে হিন্দুস্থান কেবলস পুনরুজ্জীবনের অতীত প্রচেষ্টা, যেমন মেডিক্যাল এইড সেন্টার প্রকল্প, কেন সফল হয়নি- সেই প্রশ্নও উঠছে। বামপন্থী শ্রমিক সংগঠন সিটু (CITU) ইতিমধ্যেই জমি বিক্রির বিরোধিতায় সরব হয়েছে।
রাজনৈতিক তাৎপর্য
সব মিলিয়ে ‘এক হাজার একর’ জমি আবারও রাজ্য রাজনীতির কেন্দ্রে। তবে সিঙ্গুরের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার জমি অধিগ্রহণ নয়, জমি ক্রয়ের পথে হাঁটছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। শিল্পের প্রয়োজন ও কৃষকের স্বার্থ- এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারলেই তাজপুর থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত এই এক হাজার একরের গল্প রাজ্যের শিল্পভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
