
নন্দীগ্রাম: ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে নাজেহাল হতে হচ্ছে ভারতীয়দেরই তাও আবার প্রাক্তন সেনা কর্মীদের। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র নন্দীগ্রামে সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর ভোটার তালিকা বিভ্রাট (Nandigram voter list)। শুভেন্দু অধিকারীরই নির্বাচনী বুথ, নন্দনায়েকবার ৭৯ নম্বর বুথে এই ঘটনা নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
ওই বুথে মোট ভোটার সংখ্যা ৭১১। সাম্প্রতিক SIR (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, ১১ জন ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। BLO সূত্রে জানা গেছে, এই ১১ জনের মধ্যে কেউ মৃত নন, আবার কেউ স্বেচ্ছায় ভোটার তালিকা থেকে নাম তোলেননি। অর্থাৎ, কোনও সুস্পষ্ট কারণ ছাড়াই তাদের নাম বাদ পড়েছে।
এতেই শেষ নয়। বাকি ৭০০ জন ভোটারের মধ্যে আবার চারজনকে ‘হেয়ারিং’-এর জন্য ডাকা হয়েছে। অভিযোগ, এই চারজনের সঙ্গে তাঁদের বাবার ‘লিংক’ নাকি পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের বাবার নাম নেই। অথচ বিস্ময়করভাবে যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের ছেলেমেয়েদের নাম কিন্তু ঠিকই ভোটার লিস্টে রয়েছে।
এই চারজনের মধ্যে রয়েছেন দুই প্রাক্তন ভারতীয় সেনা কর্মী প্রদীপ জানা এবং প্রদীপ প্রধান। দেশরক্ষার দায়িত্ব পালন করা এই দুই প্রাক্তন সেনাকর্মীকেও এখন প্রমাণ করতে বলা হচ্ছে, তাঁরা আদৌ ভারতীয় কিনা। নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারলেই নাকি তাঁদের নাম ফের ভোটার তালিকায় তোলা হবে।
প্রদীপ প্রধানের জীবন কাহিনি আরও হৃদয়বিদারক। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি বাবা-মা দুজনকেই হারান। ১৯৯৪ সালে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। সেই সময়ে সেনা কর্মীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন না। ফলে ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়নি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি ২০১৯ এবং ২০২৩ দু’টি লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। এত কিছুর পরেও আজ তাঁকেই আবার প্রমাণ করতে হচ্ছে তিনি ভারতীয় নাগরিক।
একইভাবে হেয়ারিংয়ের জন্য ডাকা হয়েছে সন্তোষ রানাকেও। পেশায় তিনি একজন টোটো চালক। সন্তোষ রানার স্ত্রী সীমা রানা এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। তাঁর অভিযোগ, প্রায় ৩০ বছর আগে সন্তোষ রানা উত্তরপ্রদেশ থেকে নন্দীগ্রামে আসেন। এখানেই বিয়ে, সংসার, সন্তান সবকিছু গড়ে উঠেছে। জীবিকা নির্বাহ করছেন টোটো চালিয়ে।
সীমা রানার দাবি, উত্তরপ্রদেশ থেকে আসার পর সেখানকার ভোটার তালিকা থেকে আইন মেনেই নাম কেটে নন্দীগ্রামের ভোটার লিস্টে নাম তুলেছিলেন তাঁর স্বামী। অথচ আজ তাকেও ডেকে পাঠানো হয়েছে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য। তাঁর প্রশ্ন, “যে মানুষ তিন দশক ধরে এখানে বসবাস করছে, ভোট দিচ্ছে, কর দিচ্ছে আজ তাকে কেন ভারতীয় প্রমাণ করতে হবে?”
এই পুরো ঘটনাটি ঘটেছে শুভেন্দু অধিকারীর নিজের বুথেই, যা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক মহল। একদিকে যখন অবৈধ অনুপ্রবেশ ও ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন সাধারণ ভারতীয় নাগরিক, এমনকি প্রাক্তন সেনা কর্মীদের এইভাবে হেনস্থা হওয়া প্রশাসনিক ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
নন্দীগ্রামের এই ঘটনা রাজ্য জুড়ে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা ও SIR প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিল।









