বহুদিন ধরেই বিজেপির কোনও গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠক বা কর্মসূচিতে তাঁকে সেভাবে দেখা যায়নি। রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে জল্পনাও কম ছিল না। অথচ সময়টা মোটেই সাধারণ নয়। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি কার্যত শুরু হয়ে গিয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়া, সংগঠনের পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রের নজর—সব মিলিয়ে বাংলার রাজনীতিতে আবারও উত্তাপ বাড়ছে। ঠিক এই আবহেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর বঙ্গ সফর এবং সেই সফরের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে দিলীপ ঘোষের (Dilip Ghosh) উপস্থিতি নতুন করে রাজনৈতিক চর্চা উসকে দিয়েছে।
এবারের সফরে অমিত শাহ মূলত কলকাতাকেন্দ্রিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিক বৈঠক করেন এবং তার পর রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে কোর কমিটির বৈঠকে বসেন। বুধবার ছিল বিজেপি বিধায়কদের সঙ্গে তাঁর বৈঠক। আর এই বৈঠকেই দীর্ঘদিন পর প্রকাশ্যে দেখা যায় বিজেপির প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষকে। ছ’মাস পর দলের কোনও সাংগঠনিক বৈঠকে তাঁর উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
দিলীপ ঘোষ শেষবার লোকসভা নির্বাচনের পর, গত জুন মাসে একটি সাংগঠনিক বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন। তার পর প্রায় ছ’মাস ধরে তাঁকে আর কোনও বড় দলীয় বৈঠক বা সাংগঠনিক কর্মসূচিতে দেখা যায়নি। বিজেপির মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ দলে একজন প্রাক্তন রাজ্য সভাপতির দীর্ঘ অনুপস্থিতি যে নজর এড়ায়নি, তা বলাই বাহুল্য। অনেকেই মনে করছিলেন, তিনি হয়তো দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নজর থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বলছিলেন, সংগঠনের ভিতরে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনতেই দিলীপ ঘোষকে আপাতত আড়ালে রাখা হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অমিত শাহর বঙ্গ সফরে দিলীপ ঘোষের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি সংগঠনের ভিত মজবুত করতে চাইছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেই কাজে রাজ্যের রাজনীতিতে পরিচিত মুখ, তৃণমূল-বিরোধী আক্রমণাত্মক ভাষা এবং সংগঠন গড়ার অভিজ্ঞতা—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দিলীপ ঘোষের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।
এক সময় দিলীপ ঘোষই ছিলেন রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখ। তাঁর নেতৃত্বেই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে রাজ্যে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায় বিজেপি। পরবর্তীতে বিধানসভা নির্বাচনে প্রত্যাশিত ফল না এলেও, সংগঠনের বিস্তার এবং কর্মীভিত্তি তৈরিতে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেই কারণে তাঁকে আবার সক্রিয় ভূমিকায় ফিরিয়ে আনার ভাবনা কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে।
তবে বিজেপির অন্দরমহলে এখনও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। দলের একাংশের মতে, এটি নিছকই একটি সাংগঠনিক বৈঠক, যেখানে প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি হিসেবে দিলীপ ঘোষকে ডাকা হয়েছে। আবার অন্য অংশের দাবি, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে তাঁকে বিশেষ কোনও দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে সংগঠন মজবুত করা এবং কর্মীদের চাঙ্গা করার কাজে তাঁকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষ নিজেও বিষয়টি নিয়ে এখনই কোনও মন্তব্য করেননি। তিনি বরাবরই বলে এসেছেন, দল যা দায়িত্ব দেবে, তিনি তা পালন করবেন। তাঁর এই সংযত অবস্থানও রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, ছ’মাস পর অমিত শাহর বৈঠকে দিলীপ ঘোষের উপস্থিতি শুধুমাত্র একটি ঘটনাই নয়, বরং আগামী দিনের রাজ্য রাজনীতির ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির কৌশল, নেতৃত্বের ভূমিকা বণ্টন এবং সংগঠনের ভবিষ্যৎ রূপরেখা—সবকিছুর মধ্যেই এই উপস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এখন দেখার, এই উপস্থিতি সাময়িক নাকি দিলীপ ঘোষের রাজনীতিতে আবার বড় কোনও অধ্যায়ের সূচনা।
