কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন ঘিরে নতুন করে শুরু হতে চলেছে বড়সড় প্রক্রিয়া (SIR 2.0 Voter List Revision)। আগামীকাল থেকেই রাজ্যে শুরু হচ্ছে SIR ২.০ এর শুনানি পর্ব। নির্বাচন কমিশনের এই পদক্ষেপে একদিকে যেমন স্বচ্ছতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ৬৭ লক্ষ ভোটার এখন সরাসরি নজরদারির আওতায় চলে এসেছেন, যা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।
নির্বাচন কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, SIR ২.০–এর আওতায় যাঁদের নাম নিয়ে আপত্তি বা সন্দেহ রয়েছে, তাঁদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি জমা দিয়ে নিজেদের নাগরিকত্ব ও ভোটার হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে, আধার কার্ডকে একক পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। অর্থাৎ শুধুমাত্র আধার দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম ফেরানো বা বহাল রাখা যাবে না।
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ? ভারতের ইতিহাসে শরণাগতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বেনজির
এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কারণ, SIR-এর প্রথম পর্যায়ে যে পরিমাণ নাম বাদ পড়েছে, তা নজিরবিহীন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ফেজ ১ শেষ হওয়ার পর ৫৮ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা কমে এসেছে ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ থেকে ৭ কোটি ৮ লক্ষে। এত বড় সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠছে, তেমনই বিরোধীদের তরফে অভিযোগ উঠছে ‘ভোটার বঞ্চনা’র।
SIR ২.০–এ রেহাই পেতে কোন নথি লাগবে, তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি কৌতূহল সাধারণ মানুষের। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভোটারদের জন্মস্থান, বসবাস ও নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য একাধিক নথি দেখানো যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে জন্ম শংসাপত্র, পাসপোর্ট, মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের সার্টিফিকেট, স্থায়ী বাসস্থানের প্রমাণপত্র, রেশন কার্ড বা অন্য সরকারি নথি। তবে কোন নথি গ্রহণযোগ্য হবে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের উপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আধার কার্ডকে একক পরিচয়পত্র হিসেবে না মানার সিদ্ধান্ত নতুন নয়। সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়েও বলা হয়েছে, আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, বরং পরিচয় যাচাইয়ের একটি মাধ্যম। সেই কারণেই ভোটার তালিকা সংশোধনে শুধুমাত্র আধারের উপর নির্ভর করতে চাইছে না কমিশন।
এদিকে, SIR ২.০ শুরু হওয়ার খবরে গ্রাম ও শহর দুই এলাকাতেই বাড়ছে আতঙ্ক। অনেক ভোটারের অভিযোগ, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে ভোট দিয়ে এলেও হঠাৎ করে তাঁদের নাম ‘সন্দেহজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার অনেকেই জানেনই না, তাঁদের নাম তালিকায় আছে কি না। ফলে প্রশাসনিক স্তরে সচেতনতা বাড়ানো এবং পরিষ্কার নির্দেশিকা দেওয়ার দাবি উঠছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোটার তালিকা সংশোধনের এই পর্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন ভুয়ো বা অযোগ্য ভোটার বাদ দেওয়া কমিশনের দায়িত্ব, তেমনই যোগ্য কোনও ভোটার যেন বঞ্চিত না হন, সেটাও সমানভাবে জরুরি।
SIR ২.০ সেই ভারসাম্য কতটা রক্ষা করতে পারে, সেটাই এখন দেখার। সব মিলিয়ে, আগামী কয়েক সপ্তাহ পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল হতে চলেছে। ভোটারদের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় নিজের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না তা যাচাই করা এবং প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখা।
