
দার্জিলিং: বড়দিনের মরশুমের ঠিক মুখে পাহাড় ও সমতলের গাড়ি চালকদের মধ্যে চলতে থাকা সংঘাত এবার চরমে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিনের চাপা উত্তেজনা এখন প্রকাশ্য রাস্তায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়তে চলেছে পাহাড় ভ্রমণে আসা হাজার হাজার পর্যটকের উপর। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ সমতলের গাড়ি চালকরা এবার কড়া অবস্থান নিয়েছেন। স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্যার সমাধান না হলে পাহাড়ের কোনও গাড়িকে সমতল এলাকা থেকে আর যাত্রী তুলতে দেওয়া হবে না।
এই সংঘাতের সূত্রপাত মূলত পাহাড়ে সাইট সিইংয়ের ক্ষেত্রে সমতলের গাড়ি চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপকে কেন্দ্র করে। সমতলের চালকদের অভিযোগ, পাহাড়ে পর্যটকদের নিয়ে গেলে তাঁদের নানা ভাবে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। মাঝরাস্তায় গাড়ি আটকানো, পর্যটকদের সামনে চালকদের মারধর, এমনকি কোথাও কোথাও জোর করে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ। এসবের ফলে শুধু চালকরাই নয়, চরম অস্বস্তিতে পড়ছেন পর্যটকরাও।
অন্যদিকে, সমতলের চালকদের দাবি—পাহাড়ের গাড়িগুলি কোনও বাধা ছাড়াই সমতলে নেমে পর্যটক তুলছে। এই দ্বৈত নীতির বিরুদ্ধেই এবার সরব হয়েছেন তাঁরা। সোমবার মহকুমাশাসক, জেলাশাসক, পুলিশ সুপার এবং জিটিএ প্রধানের কাছে স্মারকলিপি জমা দিয়ে নিজেদের ক্ষোভের কথা জানান সমতলের গাড়ি চালকরা। তাঁদের বক্তব্য, পাহাড়ে চালাতে না দিলে পাহাড়ের গাড়িকেও সমতলে চালাতে দেওয়া হবে না।
পর্যটন ব্যবসায়ী দেবাশিস মৈত্র বলেন, “এবার আর কোনও ছাড় নেই। প্রশাসন সব জানার পরেও চুপ করে বসে রয়েছে। পাহাড় আর সমতল—দুটোই তো বাংলার অংশ। অথচ সমতলের গাড়ি দেখলেই পাহাড়ে তেড়ে আসা হচ্ছে। এমনকি টাইগার হিল না যাওয়ার বিষয়েও প্রশাসনের কোনও উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।” তাঁর আশঙ্কা, এই পরিস্থিতি চললে বড়দিন ও বর্ষবরণের পর্যটন ব্যবসা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে।
সমতলের গাড়ি চালক সমীর পাণ্ডে জানান, “আমরা প্রায় না খেয়ে মরার জায়গায় পৌঁছে গেছি। পাহাড়ে গাড়ি চালানোই যাচ্ছে না। প্রশাসন যদি এখনই ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে আমাদের বাধ্য হয়ে পাল্টা পদক্ষেপ নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে ভবিষ্যতে ধর্মঘটের পথেও হাঁটতে পারেন তাঁরা।
সূত্রের খবর, প্রতিদিন পাহাড় থেকে প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি গাড়ি সমতলে নেমে পর্যটক নিয়ে যায়। এবার সেই পথ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পরিবহণ ব্যবস্থায় বড়সড় অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বড়দিনের ছুটিতে যারা দার্জিলিং, কালিম্পং বা সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে ইতিমধ্যেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
অন্যদিকে, পাহাড়ের গাড়ি চালকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনাইটেড ফোরাম অফ ড্রাইভার্স-এর আহ্বায়ক পাসিং শেরপা জানান, সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “জিটিএ কর্তৃক গঠিত ট্র্যাফিক উপদেষ্টা কমিটি ২৪ ডিসেম্বর একটি বৈঠক ডেকেছে। আমরা আশা করছি, এই বৈঠক থেকেই চালক ও পর্যটকদের স্বার্থে ইতিবাচক সমাধান বেরিয়ে আসবে।”
তবে ওই বৈঠকের আগে যদি প্রশাসন সক্রিয় ভূমিকা না নেয়, তাহলে বড়দিনের আগেই পাহাড়ে পর্যটন ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়তে পারে বলেই আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট মহলের। এখন দেখার, শেষ মুহূর্তে প্রশাসন কতটা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।










