সরস্বতী পুজো পড়েছে নির্ধারিত সময়ের বেশ কিছুটা আগেই। বসন্ত পুরোপুরি আসার আগেই পুজোর আয়োজন হওয়ায় প্রকৃতির সঙ্গে উৎসবের ছন্দে মিল নেই। তার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফুলের বাজারে। সরস্বতী পুজোর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত পলাশ ফুল এ বছর এখনও ঠিকভাবে ফোটেনি। গাছে লাল রঙের ছোঁয়া দেখা গেলেও পূর্ণ বিকশিত পলাশের দেখা মেলেনি বললেই চলে। তবুও পুজোর চাহিদা মেটাতে না-ফোটা পলাশের কুঁড়ি নিয়েই বাজারে হাজির হয়েছেন বিক্রেতারা। আর সেই আধ ফোটা পলাশের দাম শুনেই কার্যত মাথায় হাত ক্রেতাদের—একটি আধ ফোটা পলাশ বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়।
জলপাইগুড়ির ফুলের বাজারে সকাল থেকেই ছিল ভিড়। ছাত্রছাত্রীদের সরস্বতী পুজো, বিভিন্ন ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানের আয়োজন সব মিলিয়ে পলাশের চাহিদা তুঙ্গে। কিন্তু জোগান কম থাকায় দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে অনেকেই বাধ্য হয়ে কম ফুলেই সন্তুষ্ট হচ্ছেন। বিক্রেতাদের দাবি, এবার মরশুম আগেভাগে চলে আসায় পলাশ গাছে ফুল ফোটার সময় পায়নি। ফলে দূরদূরান্ত থেকে কুঁড়ি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, পরিবহণ খরচও বেড়েছে। তার জেরেই এই দাম।
শুধু পলাশই নয়, অন্যান্য ফুলের দামও ঊর্ধ্বমুখী। গাঁদা ফুলের একটি মালার দাম উঠেছে ৪০ টাকা। কয়েকদিন আগেও যে মালা ২৫-৩০ টাকায় পাওয়া যেত, পুজোর মুখে তার দাম বেড়ে অনেকটাই। চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধার মতো ফুলের দামও স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি। ফুল বিক্রেতারা বলছেন, চাহিদার তুলনায় জোগান অনেক কম। তার ওপর একই দিনে একাধিক অনুষ্ঠান পড়ায় বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।
এ বছর সরস্বতী পুজোর দিনেই পড়েছে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মজয়ন্তী। পাশাপাশি এই দিনটিকে বিয়ে ও অন্যান্য শুভ কাজের জন্যও বেছে নিচ্ছেন অনেকেই। ফলে এক দিনেই পুজো, দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠান এবং বিয়ের আয়োজন এই ‘একসঙ্গে সব’ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই ত্রিমুখী চাহিদার চাপেই জলপাইগুড়ির ফুলের বাজার কার্যত ‘আগুন’। ফুল বিক্রেতারা একে মজার ছলে ‘ত্রিস্পর্শ’ বললেও, ক্রেতাদের কাছে তা রীতিমতো অস্বস্তির কারণ।
পুজো উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, বাজেটের বাইরে গিয়ে ফুল কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই সাজসজ্জা ছোট করে আনতে হচ্ছে। কোথাও পলাশের বদলে অন্য ফুল ব্যবহার করা হচ্ছে, কোথাও আবার সংখ্যায় কাটছাঁট। সাধারণ পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও একই ছবি। ছোট পরিসরে পুজো সারার চেষ্টা করছেন অনেকে, যাতে খরচ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ফুল চাষিরাও বলছেন, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং মরশুমের তারতম্যের কারণে ফুল চাষে সমস্যা দেখা দিয়েছে। শীত দীর্ঘায়িত হওয়ায় পলাশের স্বাভাবিক ফুল ফোটার সময় পিছিয়ে গিয়েছে। কিন্তু পুজোর তারিখ এগিয়ে আসায় বাজারে সেই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে উৎসবের সময়সূচি ও ঋতুচক্রের এই অসামঞ্জস্য আরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে কৃষি ও বাজারে।
