
এক সময় যে সিঙ্গুর (Singur) বদলে দিয়েছিল বাংলার রাজনীতির অভিমুখ, সেই সিঙ্গুরই আবার ফিরছে রাজনৈতিক মঞ্চের কেন্দ্রে। ২০১১ পালাবদলের আগে যেমন সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, নেতাই রাজ্য রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছিল। তেমনই ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনের আগে ফের সেই সিঙ্গুরকেই হাতিয়ার করতে চাইছে বিজেপি?
সন্তোষের অভিযোগে ED অফিসে পুলিশির অভিযানের পর ‘বিস্ফোরক’ বিরোধী দলনেতা
১৮ বছর আগে সিঙ্গুরের মাটিতে থেমে গিয়েছিল টাটার ন্যানো কারখানার স্বপ্ন। এবার সেই মাটিতেই ১৮ জানুয়ারি সভা করতে আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi)। বিজেপির লক্ষ্য স্পষ্ট, তৃণমূলের ‘অ্যান্টি-ইন্ডাস্ট্রি’ তকমাকে ফের সামনে এনে বাংলার রাজনৈতিক হাওয়া ঘোরানো।
তবে আজকের সিঙ্গুরে দাঁড়িয়ে শিল্প স্বপ্নের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া কঠিন। কংক্রিট ভাঙা জমি, পাথরের স্তূপ, জঙ্গল, শেয়ালের উপদ্রব। সঙ্গে চাষের উপযোগী নয় বহু জমি। ২০১৬ সালে সুপ্রিম কোর্ট জমি অধিগ্রহণ বেআইনি ঘোষণা করে কৃষকদের জমি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে সেই জমির বড় অংশ আজও অনাবাদি। সেই প্রসঙ্গে এক কৃষক জানান, “জমি ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু চাষ করা যায় না। জেসিবি দিয়ে খুঁড়লেও পাথর বেরোয়। নিজের পয়সায় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করেও পুরো জমি বাঁচাতে পারিনি।”
২০০৬ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শিল্প নীতির মুখ হয়ে সিঙ্গুরে টাটা ন্যানো কারখানার ঘোষণা। তার বিরোধিতায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনশন, আন্দোলন, রাস্তা অবরোধ। ২০০৮ সালে টাটার বিদায়। আর তার পরেই ২০১১ বামফ্রন্টের পতন, তৃণমূলের উত্থান। তাই সিঙ্গুর হয়ে উঠেছিল ‘শিল্প বনাম কৃষি’, ‘উন্নয়ন বনাম জীবিকা’র প্রতীক।
দেশরক্ষায় অটল ভারতীয় সেনাবাহিনীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বিশেষ বার্তা নমো’র
কিন্তু আজ সেই সিঙ্গুরেই বিজেপির সভা। অথচ অতীতে এই সিঙ্গুর আন্দোলনে বিজেপি ছিল মমতার পাশে। ২০০৬ সালে ধর্মতলায় মমতার অনশনে হাজির হয়েছিলেন তৎকালীন বিজেপি সভাপতি রাজনাথ সিং। অতীত স্মরণ করতেই বিজেপি নেতা তথাগত রায় নিজেই স্বীকার করেন, “সিঙ্গুরে আমরা ভুল করেছিলাম। রাজনীতিতে ভুল হয়।”
কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বিজেপির বক্তব্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শিল্প ধ্বংস করেছেন, বাংলাকে পিছিয়ে দিয়েছেন। তাই বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় সিং মাহাতো বলেন, “যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল বাংলাকে শিল্পহীন করতে, সেই জায়গা থেকেই বাংলার উন্নয়নের ঘোষণা হবে।”
পাল্টা তৃণমূলের দাবি করেন তারা শিল্পবিরোধী নয়। কুণাল ঘোষ বলেন, “কৃষিজমি রক্ষা করেই শিল্প, নীতিতেই কাজ করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্ষুদ্র, মাঝারি থেকে বৃহৎ শিল্প সব ক্ষেত্রেই কাজ হচ্ছে।”
আজ সিঙ্গুর শুধু এক জায়গার নাম নয়। বরং ক্ষমতা বদলের স্মৃতি, শিল্পের স্বপ্নভঙ্গ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও অবস্থান বদলের দলিল। বাম-কংগ্রেস এখন কার্যত প্রান্তিক। মূল লড়াই তৃণমূল বনাম বিজেপি। আর সেই লড়াইয়ে বিজেপি চাইছে অতীতের ক্ষত খুঁড়ে তুলে তৃণমূলকে কোণঠাসা করতে। প্রশ্ন থাকছে একটাই, যে সিঙ্গুরে না হলো শিল্প, না হলো চাষ, সেই সিঙ্গুর কি এবার হবে বিজেপির ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি?










