
মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার সামশেরগঞ্জে এক হৃদয়বিদারক খুনের ঘটনায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তারাপুর হাসপাতালের পেছনের বাগান থেকে উদ্ধার হয়েছে এক মহিলার রক্তাক্ত ও অর্ধনগ্ন মৃতদেহ। মৃতদেহের পাশেই জখম ও আতঙ্কিত অবস্থায় উদ্ধার হয় তাঁর তিন বছরের পুত্র সন্তান। এই ঘটনায় তদন্তে নেমে অবশেষে অভিযুক্ত হিসেবে ইদ্রিস আলি ওরফে মিঠুন (৪২)–কে গ্রেফতার করেছে সামশেরগঞ্জ থানার পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত ইদ্রিস আলির বাড়ি সামশেরগঞ্জ থানার তারাপুর ১ নম্বর কলোনিতে হলেও বিয়ের পর প্রায় দশ বছর ধরে তিনি সাগরদিঘী থানার অন্তর্গত চাঁদপাড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতেই থাকতেন। পেশায় তিনি ভিনরাজ্যের শ্রমিক। ঘটনার পর থেকেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করেছিলেন বলে অভিযোগ। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে শুক্রবার সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে বৃহস্পতিবার সকালে। স্থানীয় বাসিন্দারা তারাপুর হাসপাতালের পেছনের বাগানে রক্তাক্ত অবস্থায় এক মহিলার দেহ পড়ে থাকতে দেখেন। দেহটি ছিল অর্ধনগ্ন ও ক্ষতবিক্ষত। পাশে কান্নার শব্দ শুনে তাঁরা দেখতে পান, ওই মহিলার তিন বছরের শিশুপুত্র জখম অবস্থায় পড়ে রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে সামশেরগঞ্জ থানায় খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় এবং আহত শিশুটিকে দ্রুত চিকিৎসার জন্য জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
শুরুতে মৃত মহিলার পরিচয় জানা যায়নি। পরে শুক্রবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া খবর ও ছবি দেখে জঙ্গিপুর মহকুমা হাসপাতালে পৌঁছান পরিবারের সদস্যরা। তাঁরা নিশ্চিত করেন, মৃত মহিলার নাম মুসবেড়া বিবি। তাঁর বাড়ি সাগরদিঘী থানার মনিগ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায়। আহত শিশুটি তাঁরই পুত্র সন্তান।
পরিবারের দাবি, সোশ্যাল মিডিয়ায় খবর দেখেই তাঁরা জানতে পারেন যে নিহত মহিলা তাঁদের পরিবারের সদস্য। পরিবারের তরফে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, মুসবেড়া বিবির সঙ্গে এক ব্যক্তির বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল এবং সেই প্রেমঘটিত সম্পর্কের জেরেই তাঁকে খুন করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ওই ব্যক্তিই ইদ্রিস আলি।
পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে ইদ্রিস আলির নাম উঠে আসে। খুনের ঘটনার পর থেকেই তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে ছিলেন। শুক্রবার তাঁকে গ্রেফতার করার পর জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তবে খুনের প্রকৃত কারণ ও ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানতে আরও তদন্ত প্রয়োজন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
শনিবার ধৃত ইদ্রিস আলি ওরফে মিঠুনকে জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতে তোলা হয়। পুলিশ তাঁর ১০ দিনের হেফাজতের আবেদন জানিয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এই খুনে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিচার করে পুলিশ কোনও দিকই উড়িয়ে দিচ্ছে না।
এদিকে আহত শিশুটির শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশুটির শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে, তবে সময়মতো চিকিৎসা শুরু হওয়ায় তার প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। শিশুটি এখনও মানসিকভাবে অত্যন্ত আতঙ্কিত।
ঘটনাকে ঘিরে গোটা সামশেরগঞ্জ এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, হাসপাতালের এত কাছে এমন নৃশংস ঘটনা কীভাবে ঘটল। নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। তাঁরা দোষীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে মহিলার মৃত্যুর সঠিক কারণ স্পষ্ট হবে। ধর্ষণ, নির্যাতন বা অন্য কোনও নৃশংসতার বিষয় রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনও চূড়ান্ত মন্তব্য করতে নারাজ পুলিশ।
এই ঘটনায় আবারও মহিলাদের নিরাপত্তা ও পারিবারিক সহিংসতার বিষয়টি সামনে এল। তদন্তের অগ্রগতির দিকে নজর রাখছে গোটা জেলা।










