বঙ্গে সঙ্ঘ প্রধান, লক্ষ্মীবারে শিলিগুড়িতে মোহন ভাগবত

Mohan Bhagwat Siliguri visit

চার দিনের সফরে বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে পৌঁছালেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) প্রধান মোহন ভাগবত। দুপুরে তিনি বাগডোগরা বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সফরের প্রথম দিনেই উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করে তাঁর কর্মসূচি নির্ধারিত হয়েছে।

এদিন মোহন ভাগবতের একটি মাত্র প্রকাশ্য কর্মসূচি রয়েছে। বিকেলে শিলিগুড়িতে আয়োজিত তরুণদের এক সম্মেলনে ভাষণ দেওয়ার কথা তাঁর। সংঘ সূত্রে জানা গিয়েছে, তরুণ সমাজের মধ্যে সংগঠনের আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরাই এই সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্য।

   

দিনের বাকি সময়ে আরএসএস প্রধান একাধিক ঘরোয়া আলোচনায় অংশ নেবেন। সংগঠনের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েই এই বৈঠকগুলি হবে বলে জানা যাচ্ছে।

শুক্রবার আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক বৈঠক

আগামীকাল, শুক্রবার তিনি আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক বৈঠকে উপস্থিত থাকবেন। ওই বৈঠক থেকে রাজ্যের সংগঠনকে দিশা ও দিকনির্দেশ দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, রাজ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে উত্তাপের আবহে মোহন ভাগবতের এই সফর বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

শনিবার কলকাতায় পৌঁছনোর কথা রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতের। রবিবার বিকেলে শহর ছাড়ার আগে একাধিক দফায় সাংগঠনিক বৈঠকে বসবেন তিনি। এই সফর ঘিরে রাজ্য প্রশাসন কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলিও। ভাগবতের প্রতিটি কর্মসূচির স্থানেই বাড়তি নজরদারি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে।

রাজনৈতিক তাৎপর্য

তবে নিরাপত্তা বন্দোবস্তের থেকেও বেশি আলোচনায় ভাগবতের এই বাংলা সফরের রাজনৈতিক তাৎপর্য। আরএসএস সূত্রের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সংঘের শতবর্ষ উপলক্ষে দেশের বড় বড় রাজ্যগুলিতে সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভাগবত। সেই সফরের মধ্য দিয়ে তিনি রাজ্যভিত্তিক সাংগঠনিক শক্তি, দুর্বলতা ও ভবিষ্যৎ কৌশল খতিয়ে দেখছেন। একই সঙ্গে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি দিশা নিয়েও অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা চলছে।

সংঘের অন্দরমহলে জল্পনা, ৭৫ বছর বয়স পেরোনোর পর ধাপে ধাপে সংগঠন প্রধানের দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রস্তুতিও শুরু করেছেন ভাগবত। সাম্প্রতিক সফরগুলির মাধ্যমে তিনি মূল্যায়ন করতে চাইছেন—নিজের নেতৃত্বে সংঘ কোথা থেকে কোথায় পৌঁছেছে এবং আগামী দিনে নেতৃত্বের রূপরেখা কেমন হওয়া উচিত।

সফরের সঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের যোগ

তবে রাজনৈতিক মহল ও বিরোধী দলগুলির মতে, এই সফরের সঙ্গে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের যোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। তাঁদের বিশ্লেষণ, এবার ভোটে ধর্মীয় মেরুকরণ আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। সেই সমীকরণ মাথায় রেখেই বিজেপি ও তৃণমূল—দুই শিবিরই আগেভাগে নিজেদের কৌশল সাজাতে শুরু করেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই গেরুয়া শিবিরের সংখ্যালঘু রাজনীতিতে সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক সভায় ‘রাষ্ট্রবাদী মুসলমান’-দের কাছে টানার বার্তা দিয়েছেন। এই অবস্থান আরএসএসের দীর্ঘদিনের ভাবনার সঙ্গেই সাযুজ্যপূর্ণ।

মুসলিম সমাজকে দুই ধারায় ভাগ

আরএসএস বরাবরই মুসলিম সমাজকে এককভাবে না দেখে দুই ধারায় ভাগ করে বিবেচনা করে এসেছে। যারা ভারতের সনাতন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও রাষ্ট্রচেতনার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত মনে করেন, সংঘ তাদের ‘রাষ্ট্রবাদী মুসলমান’ হিসেবে চিহ্নিত করে। এই দর্শনের বাস্তব রূপ হলো আরএসএসের ছাতার তলায় থাকা ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চ’।

উল্লেখযোগ্যভাবে, মোহন ভাগবত সংঘ প্রধান হওয়ার পর এই সংগঠনের একাধিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকেছেন। মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের মঞ্চ থেকেই তিনি প্রথম বলেছিলেন—ভারতে হিন্দু ও মুসলমানের ডিএনএ অভিন্ন। তাঁর বক্তব্যের সারকথা ছিল, ধর্ম ভিন্ন হলেও ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক শিকড় এক।

এই অবস্থান থেকেই স্পষ্ট, বাংলায় বিজেপির একাংশ নেতা এতদিন যেভাবে মুসলিম সমাজকে কার্যত সম্পূর্ণ বিরোধী শিবিরে ঠেলে দিয়েছেন, আরএসএস সেই কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি সহমত নয়। বরং মুসলিম সমাজের একটি অংশকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে কাছে টানার পক্ষেই সংঘ।

মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরানো লক্ষ্য

রাজনৈতিক মহলের ধারণা, সেই কাজটি বাংলায় বিজেপির হয়ে এবার অনেকটাই সংগঠিতভাবে করছে আরএসএস। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের মুসলিম ভোটব্যাঙ্কে ফাটল ধরানো গেরুয়া শিবিরের অন্যতম বড় লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আরএসএসের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও সামাজিক প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লি, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও বিহারের বিধানসভা নির্বাচনে আরএসএসের সক্রিয় ভূমিকা বিজেপির পক্ষে ফলপ্রসূ হয়েছে। এমনকি উত্তরপ্রদেশেও মুসলিম সমাজের একাংশ বিজেপির দিকে ঝুঁকেছিল বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মত, যার নেপথ্যে সংঘের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কাজ করেছে।

এই সমস্ত প্রেক্ষাপটেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবতের চার দিনের বাংলা সফর রাজনৈতিক মহলে বাড়তি গুরুত্ব ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, কোনও রকম ঝুঁকি এড়াতে তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রয়েছে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বাহিনী।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন