বলাগড়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারীর (Manoranjan Byapari) একটি ফেসবুক পোস্ট ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। নিজের দীর্ঘ লেখায় তিনি জাতপাত, শিক্ষা, ইতিহাস এবং সমাজের অগ্রগতিকে কেন্দ্র করে যে মন্তব্য করেছেন, তা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে রানী রাসমণি, নিম্নবর্ণ সমাজ এবং ধর্মীয় আচারের প্রসঙ্গ টেনে আনা বক্তব্যকে ঘিরে ক্ষোভ যেমন তৈরি হয়েছে, তেমনই কেউ কেউ এটিকে আত্মসমালোচনার ভাষা বলেও ব্যাখ্যা করছেন।
ফেসবুক পোস্টে মনোরঞ্জন ব্যাপারী লেখেন, “সেই যে একটা গান আছে, দোষ কারো নয়কো মা, আমি সখাত সলিলে ডুবে মরি শ্যামা।” এই লাইন উদ্ধৃত করে তিনি মূলত সমাজের নিজের ব্যর্থতার দিকেই আঙুল তুলেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, যখন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ঋণ করে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করছিলেন সমাজকে শিক্ষিত ও আধুনিক করার লক্ষ্যে, তখন একই সময়ে “নিম্ন জাতির বিত্তবান রানী রাসমণি দক্ষিণেশ্বরে কালী মন্দির বানাচ্ছিলেন উঁচু জাতের কাছ থেকে কল্কে পাওয়ার জন্য।” তাঁর দাবি, চাইলে রাসমণি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে তুলতে পারতেন।
এই বক্তব্য ঘিরেই মূল বিতর্ক। অনেকেই মনে করছেন, রানী রাসমণির মতো ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে সম্মানিত ব্যক্তিত্বকে এভাবে উপস্থাপন করা অবমাননাকর। আবার অন্য অংশের মতে, বিধায়ক আসলে ধর্মীয় আচার বনাম শিক্ষার অগ্রাধিকার—এই সামাজিক দ্বন্দ্বকেই সামনে আনতে চেয়েছেন।
পোস্টে মনোরঞ্জন ব্যাপারী আরও লেখেন, দেশভাগের পরে পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উচ্চবর্ণের মানুষরা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষায় জোর দেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল ছেলে-মেয়েরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অধ্যাপক, অফিসার কিংবা রাজনীতিবিদ হয়ে উঠুক এবং ক্ষমতার কাঠামোয় নিজেদের জায়গা তৈরি করুক। তাঁর ভাষায়, “রাজ ক্ষমতা দখল করে।”
এর বিপরীতে তিনি নিজের সম্প্রদায়ের সামাজিক আচরণ ও প্রবণতার কঠোর সমালোচনা করেছেন। লিখেছেন, “আমাদের নমো আর মতুয়া জাতের মানুষরা তখন গলায় আইচার মালা, মাথায় বড় বড় চুল, বড় বড় ডঙ্কা নিয়ে লাফিয়েছি, ঝাঁপিয়েছি, মাতাম দিয়েছি, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়েছি।” তিনি আরও বলেন, কীর্তনের আসরে নাটক করে কাঁদা, আবেগে ভেসে যাওয়াকেই সমাজের বড় অংশ গুরুত্ব দিয়েছে, কিন্তু শিক্ষা ও সংগঠনের দিকে নজর দেয়নি।
এই প্রসঙ্গে তিনি মতুয়া সমাজের অন্যতম পথপ্রদর্শক গুরুচাঁদ ঠাকুরের কথাও উল্লেখ করেন। মনোরঞ্জন ব্যাপারীর দাবি, গুরুচাঁদ ঠাকুর বারবার শিক্ষার উপর জোর দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, “যে জাতির দল নেই সে জাতির বল নেই।” কিন্তু সেই আহ্বান মানা হয়নি বলেই আজও রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার প্রশ্নে এই সমাজ পিছিয়ে রয়েছে বলে তাঁর মত।
বিধায়ক আরও লেখেন, নিজেদের জন্য কোনও শক্ত রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা হয়নি, রাজক্ষমতায় অংশীদার হওয়ার পরিকল্পনাও করা হয়নি। এই আত্মসমালোচনার সুরেই তিনি আন্তর্জাতিক তুলনাও টানেন। তাঁর লেখায় উঠে আসে ইহুদি সমাজের উদাহরণ। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বে প্রায় এক কোটি ইহুদি বসবাস করলেও শিক্ষা ও গবেষণায় তাদের অবদান বিপুল। প্রায় দেড়শোর মতো নোবেল পুরস্কার ইহুদি সমাজের মানুষ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। আইনস্টাইন ও কার্ল মার্কসের মতো মনীষীর জন্মও এই সমাজে—এ কথাও লেখেন বিধায়ক।
এর বিপরীতে তিনি আক্ষেপের সুরে লেখেন, প্রায় সাড়ে ছয় কোটি মানুষ নিয়ে গঠিত নমঃশূদ্র বা মতুয়া সমাজ আজও কেবল “ভিড়” হয়েই রয়ে গেছে। তাঁর মন্তব্য, আগামী পঞ্চাশ বা একশো বছরেও এই জাতির বড় কোনও উত্থান হবে বলে তাঁর মনে হয় না।
এই বক্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন পড়ে যায়। তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরেই অনেকে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন বলে সূত্রের খবর। কেউ কেউ মনে করছেন, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে এমন ভাষা ও তুলনা রাজনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর এবং সমাজের একটি অংশকে আঘাত করতে পারে। আবার দলের অন্য অংশের বক্তব্য, মনোরঞ্জন ব্যাপারী বরাবরই স্পষ্টভাষী এবং তাঁর লেখার উদ্দেশ্য অপমান নয়, বরং আত্মসমালোচনা ও সমাজকে নাড়া দেওয়া।
বিরোধী শিবিরও এই পোস্টকে হাতিয়ার করেছে। বিজেপি ও অন্যান্য দল দাবি করেছে, তৃণমূলের এক বিধায়কের লেখাই প্রমাণ করছে যে দলটির ভিতরে জাতিগত ও সামাজিক বিভাজনের দৃষ্টিভঙ্গি কতটা গভীরে রয়েছে। একই সঙ্গে রানী রাসমণিকে নিয়ে মন্তব্যকে “ঐতিহাসিক বিকৃতি” বলেও আক্রমণ করা হচ্ছে।
সমাজমাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়াও বিভক্ত। কেউ বলছেন, মনোরঞ্জন ব্যাপারী কঠিন হলেও সত্য কথা বলেছেন, যা দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বাইরে ছিল। আবার অনেকে বলছেন, আত্মসমালোচনার নামে তিনি ধর্মীয় বিশ্বাস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে অসম্মান করেছেন।
সব মিলিয়ে, বলাগড়ের তৃণমূল বিধায়কের এই ফেসবুক পোস্ট রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জাতি, শিক্ষা, ধর্ম ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে এই লেখা। এখন দেখার, দলীয় নেতৃত্ব বা প্রশাসনিক স্তরে এই মন্তব্য নিয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসে কি না, নাকি বিষয়টি শুধুই সামাজিক মাধ্যমের বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে।
