বাংলাদেশের এক ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ফের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কে উত্তাল বাংলা। বাংলাদেশের নোয়াখালির বাসিন্দা মৌলানা রফিকুল্লাহ আনসারি সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে উদ্দেশ করে একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেন, যেখানে তিনি তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার দাবি করেন। সেই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। বিষয়টি ঘিরে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন বলাগড়ের তৃণমূল কংগ্রেস বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারি (Manoranjan Byapari)।
রবিবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টে মনোরঞ্জন ব্যাপারি এই ঘটনাকে “অসভ্যতা ও নৈতিক অধঃপতনের চূড়ান্ত উদাহরণ” বলে আখ্যা দেন। তিনি লেখেন, বাংলাদেশকে তিনি বরাবরই ভালোবাসেন এবং সে দেশের মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে, কারণ তাঁর শিকড় ওই ভূখণ্ডের মাটিতে প্রোথিত। একসময় সুযোগ পেলে বারবার বাংলাদেশে যাওয়ার ইচ্ছার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তবে ওই পোস্টে মনোরঞ্জন দাবি করেন, সাম্প্রতিক এই মন্তব্য তাঁকে গভীরভাবে আহত ও ক্ষুব্ধ করেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একজন ধর্মীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তির কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য শুধু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেই নয়, গোটা সমাজকেই অপমান করে। তিনি লেখেন, এই ধরনের আচরণের ফলে ইসলাম ধর্ম ও মুসলমান সমাজকে অহেতুক বিদ্বেষের মুখে পড়তে হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
তৃণমূল বিধায়কের অভিযোগ, যেসব মানুষ অতীতে সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন, তাঁদের একাংশ এখন এই ঘটনায় নীরব বা উল্টে ওই ব্যক্তির পক্ষেও সওয়াল করছেন। এই নীরবতাকেই তিনি আরও বেশি লজ্জাজনক বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, কোনও নারী মুখ্যমন্ত্রী সম্পর্কে এমন মন্তব্যের পর সমাজের সর্বস্তরের মানুষের একযোগে প্রতিবাদ হওয়া উচিত ছিল।
মনোরঞ্জন ব্যাপারি তাঁর পোস্টে ধর্মীয় সমাজের বিবেক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তিনি আক্ষেপ করে লেখেন, আজ কি আর বিবেকবান ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ জন্মাচ্ছেন না—এই প্রশ্ন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, কিছু ব্যক্তির দায়িত্বজ্ঞানহীন ও কুরুচিকর আচরণের জন্য পুরো একটি ধর্ম ও সম্প্রদায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে, যা আদৌ কাম্য নয়।
যদিও ওই ফেসবুক পোস্টে তিনি অত্যন্ত কড়া ও আবেগপ্রবণ ভাষা ব্যবহার করেছেন, রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, এমন ভাষা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করতে পারে। বিরোধী শিবির থেকে ইতিমধ্যেই অভিযোগ উঠেছে, একজন জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে সংযত ও দায়িত্বশীল মন্তব্য প্রত্যাশিত ছিল। অন্যদিকে তৃণমূলের একাংশের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে অশালীন মন্তব্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করাটা স্বাভাবিক, যদিও ভাষা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে।
এদিকে মৌলানা রফিকুল্লাহ আনসারির মন্তব্য নিয়ে বাংলাদেশেও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, এই ধরনের বক্তব্য ইসলাম ধর্মের মূল শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তা দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ও বিদ্বেষ ছড়াতে পারে। সামাজিক মাধ্যমে বহু বাংলাদেশি নাগরিক ওই মন্তব্য থেকে নিজেদের দূরে রাখার কথাও জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য কীভাবে সীমান্ত পেরিয়ে কূটনৈতিক ও সামাজিক অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে যখন তা কোনও নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরে হয়, তখন বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য এবং তার প্রতিক্রিয়ায় মনোরঞ্জন ব্যাপারির ফেসবুক পোস্ট—দুটিই এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে। প্রশ্ন উঠছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শালীনতার সীমারেখা কোথায় টানা উচিত এবং ধর্ম ও রাজনীতির সংমিশ্রণে কীভাবে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা যায়। এই বিতর্ক আগামী দিনে আরও কী রূপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্য ও দেশের রাজনৈতিক মহল।
