রাজ্য রাজনীতিতে ফের তীব্র চাঞ্চল্য। তৃণমূল কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, (Sukanta Majumdar)জন উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর এবং কলকাতার মেয়র তথা রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপি রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের বিস্ফোরক মন্তব্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তাঁর দাবি, হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে তৃণমূলের অন্দরে ছিল গভীর আঁতাত, তবে সুযোগ বুঝে শেষ চালটি চালেন ফিরহাদ হাকিম।
ফের নিশানায় সংখ্যালঘুরা, বাংলাদেশের পিরোজপুরে হিন্দু বাড়িতে অগ্নিসংযোগ
দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুকান্ত মজুমদার বলেন, “হুমায়ুন কবীর সম্পর্কে এখনই খুব বেশি সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক হবে না। আমাদের কাছে যে তথ্য আছে, তাতে দেখা যাচ্ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় লাগাতার হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন এবং তাঁকে নিজের দলে ধরে রাখার চেষ্টা করছিলেন।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত, তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ হুমায়ুনকে পুরোপুরি ছেড়ে দিতে চাইছিল না।
সুকান্ত আরও বলেন, “কিন্তু যখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোনও কারণে আমেরিকা সফরে যান, ঠিক তখনই চালটা দেন ফিরহাদ হাকিম। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবেই পরিচিত ফিরহাদ হাকিম সেই সুযোগে হুমায়ুন কবীরকে সাসপেন্ড করিয়ে দেন।” বিজেপি সভাপতির দাবি অনুযায়ী, তৃণমূলের অন্দরে ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রভাব বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্বই এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে।
এখানেই থামেননি সুকান্ত মজুমদার। হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে সমালোচনাকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যাঁরা এখন হুমায়ুন কবীরকে নিয়ে নানা হিসাব কষছেন, তাঁদের একটু ধৈর্য ধরা উচিত। এই মানুষটা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবেন, কেউ জানে না।” রাজনৈতিক মহলে এই মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে জল্পনা তবে কি হুমায়ুন কবীর বিজেপিতে যোগ দিতে পারেন, নাকি অন্য কোনও নতুন সমীকরণ তৈরি হতে চলেছে?
এই আবহেই কলকাতায় পাল্টা প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন জন উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর নিজেই। তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আমি তৃণমূলকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করছি। শেষ কথা বলবে মানুষ।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট বিদ্রোহী সুর। হুমায়ুন আরও বলেন, “নির্বাচনের ফল বেরোলে ওরা অবাক হয়ে যাবে।” এই মন্তব্য রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
হুমায়ুন কবীরের এই ঘোষণাকে অনেকেই সরাসরি তৃণমূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা বলেই দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ওঠানামা চলছিল। কখনও ঘনিষ্ঠতা, কখনও দূরত্ব এই দোলাচলের মধ্যেই তাঁর দল জন উন্নয়ন পার্টির ভবিষ্যৎ দিশা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সুকান্ত মজুমদারের বক্তব্য একদিকে যেমন তৃণমূলের অন্দরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্বকে সামনে আনছে, তেমনই বিজেপির কৌশলকেও ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিজেপি যে হুমায়ুন কবীরকে পুরোপুরি বাতিল করে দিতে চাইছে না, বরং ভবিষ্যতের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমীকরণে তাঁকে একটি ‘খোলা অপশন’ হিসেবে দেখছে সুকান্তর কথায় তারই ইশারা মিলছে।
অন্যদিকে তৃণমূল শিবিরে এই মন্তব্য অস্বস্তি বাড়িয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বনাম ফিরহাদ হাকিম—এই দ্বন্দ্ব নতুন নয়, কিন্তু প্রকাশ্যে এমন ইঙ্গিত রাজ্য রাজনীতিতে বিরল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ দুই নেতার মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে টানাপোড়েনের কথা বিজেপি মুখে বলায় রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, হুমায়ুন কবীরকে ঘিরে ত্রিমুখী রাজনীতি তৃণমূল, বিজেপি ও তাঁর নিজের দল এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। সামনে নির্বাচন যত এগোবে, ততই স্পষ্ট হবে কে কাকে ব্যবহার করছে, কে কাকে ছেড়ে দিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এই নাটকীয় রাজনৈতিক অধ্যায়। আপাতত একটাই পরিষ্কার অভিষেক-হুমায়ুন সম্পর্ক, ফিরহাদের ভূমিকা এবং সুকান্তর বিস্ফোরক মন্তব্য রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে।
