কলকাতা: এ যেন ঠিক সুকুমার রায়ের হযবরল। ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল(SIR voter list controversy)। রাজনৈতিক ময়দানে রাতারাতি বদলে যায় দল, মত, আদর্শ। কিন্তু তাই বলে রাতারাতি ধর্ম ও পদবি বদলে যাওয়া। তাও আবার নির্বাচন কমিশনের সরকারি নথিতে। এমন ঘটনা কার্যত নজিরবিহীন। বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া শেষে প্রকাশিত খসড়া ভোটার তালিকায় এমনই এক চাঞ্চল্যকর ‘ভুল’ সামনে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় শুরু হয়েছে।
১৬ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের SIR-পরবর্তী খসড়া ভোটার তালিকা। আর সেই তালিকায় নিজের নাম খুঁজতে গিয়েই কার্যত চমকে যান সিপিআইএম-এর রাজ্য সম্পাদক ও প্রাক্তন সাংসদ মহম্মদ সেলিম এবং তাঁর পরিবার। তালিকায় দেখা যাচ্ছে, মহম্মদ সেলিম এবং তাঁর ছেলে আতিশ আজিজ দু’জনের নামের পাশেই পদবি হিসেবে যুক্ত হয়েছে ‘অবস্থি’, যা সাধারণত একটি ব্রাহ্মণ পদবি হিসেবেই পরিচিত।
দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজ থেকে ছিটকে গেলেন ভারতীয় তারকা ব্যাটার
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হল, আতিশ আজিজের ভোটার তথ্য অনুযায়ী তাঁর পিতার নাম লেখা রয়েছে ‘মহম্মদ সেলিম অবস্থি’। অর্থাৎ একজন সুপরিচিত মুসলিম বাম নেতাকে সরকারি নথিতে কার্যত ‘ব্রাহ্মণ’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই এই তথ্য প্রকাশ্যে আসতেই রাজনৈতিক মহলে প্রশ্নের ঝড় উঠেছে SIR প্রক্রিয়ার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে, এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বশীলতা নিয়েও।
এই তথ্য সামনে আনেন খোদ আতিশ আজিজ নিজেই। তিনি ফেসবুকে নিজের ভোটার তথ্যের স্ক্রিনশট পোস্ট করে কটাক্ষের সুরে লেখেন, “মিডিয়া আর বিজেপি বলছিল SIR করে মোল্লাদের টাইট দেওয়া হবে। কিন্তু দেখছি নির্বাচন কমিশন আমাকে আর আমার বাবাকে ব্রাহ্মণ বানিয়ে দিল!” তাঁর এই পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায় এবং নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়।
ঘটনা জানার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া দেন মহম্মদ সেলিম। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, “SIR-এর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকে নির্বাচন কমিশন কতটা হালকাভাবে নিয়েছে, এই ভুল তার প্রমাণ। আধিকারিকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, প্রস্তুতিতে ছিল বড় ঘাটতি।” তাঁর অভিযোগ, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (CEO) এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) মিলে এই গোটা প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছেন।
সেলিম আরও বলেন, “আমার মতো পরিচিত একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রেই যদি এমন ভুল হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের ভোটার তথ্যের কী অবস্থা হয়েছে, তা সহজেই অনুমেয়।” একই সুর শোনা যায় আতিশ আজিজের কণ্ঠেও। তিনি সংবাদ সংস্থা PTI-কে বলেন, “দশকের পর দশক ধরে আমার বাবা রাজনীতিতে রয়েছেন। তাঁর তথ্যেই যদি এমন গুরুতর ভুল থাকে, তাহলে সাধারণ ভোটারদের তথ্য কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে উদ্বেগ থাকাই স্বাভাবিক।”
এদিকে নির্বাচন কমিশনের তরফে অবশ্য বিষয়টিকে ‘ডাটা এন্ট্রি জনিত ভুল’ বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের একটি সূত্র জানিয়েছে, চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে, অর্থাৎ আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যেই এই ধরনের সব ভুল সংশোধন করে নেওয়া হবে।
আতিশ আজিজ জানিয়েছেন, তিনি কলকাতা বন্দর এলাকার ভোটার এবং ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট বুথ লেভেল এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশোধনের আবেদন করেছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পরই জানা গিয়েছে, প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কমিশনের দাবি অনুযায়ী, এর মধ্যে ২৪ লক্ষ ভোটারকে ‘মৃত’, ১৯ লক্ষকে ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ এবং ১২ লক্ষকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভোটের আগে এত বিপুল সংখ্যক নাম বাদ যাওয়া এবং মহম্মদ সেলিমের মতো হেভিওয়েট নেতার নামের এমন বিভ্রাট রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। SIR আদৌ স্বচ্ছ ও নির্ভুল হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
