কলকাতা: বঙ্গে ভোটার তালিকার স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়ছে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে শুরু হলেও, এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে এখন জোর চর্চা রাজনৈতিক মহলে। প্রশ্ন একটাই SIR আবহে বিধানসভা নির্বাচনে তুল্য মূল্যের বিচারে এগিয়ে কে? সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে, এই পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ার পর রাজ্যের ভোট-সমীকরণে বড়সড় বদল আসতে পারে।
বিজেপির অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে ১৬২টি আসনকে ‘A’ ক্যাটাগরিতে রাখা হয়েছে অর্থাৎ, যেসব আসনে বিজেপি নিজেদের ভালো অবস্থানে রয়েছে বলে মনে করছে। এই হিসেবের পেছনে রয়েছে SIR-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার সম্ভাব্য পরিবর্তন এবং তার নির্বাচনী প্রভাব।
রেশন কার্ডধারীদের জন্য সতর্কতা! এই কাজ না করলে জানুয়ারি থেকে বন্ধ ফ্রি রেশন
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়। SIR শুরু হওয়ার আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল আনুমানিক ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ। প্রথম ধাপেই তালিকা থেকে বাদ পড়েছে প্রায় ৫৮ লক্ষ ভোটার। পাশাপাশি, আগের SIR থেকে প্রায় ৩১ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটার রয়েছেন যাঁদের নাম বা পারিবারিক তথ্য পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে মেলানো যায়নি। প্রশাসনিক সূত্রের মতে, এই ভোটারদের বড় অংশের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর এই পরিসংখ্যানের উপর ভরসা রেখেই যুদ্ধের ছক সাজাচ্ছে পদ্ম শিবির।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও একটি বড় সংখ্যা। প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ ভোটারকে নথিপত্র যাচাইয়ের জন্য ফ্ল্যাগ করা হয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের নাগরিকত্ব বা ঠিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সব মিলিয়ে, বর্তমানে রাজ্যে মোট ‘সাসপিশাস’ বা সন্দেহভাজন ভোটারের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লক্ষ। বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করেছে এই ভুয়ো ভোটাররা সবাই তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক। তাই এদের নাম বাদ পড়লে বেশ অনেকটাই পিছিয়ে যাবে শাসক দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, যদি এই সন্দেহভাজন ভোটারদের মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশের নামও বাদ পড়ে, তবে প্রায় ৫০ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে ছিটকে যেতে পারেন। সেই ক্ষেত্রে মোট বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা পৌঁছবে ১ কোটি ৮ লক্ষে, যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় ১৪ শতাংশ। এই মাত্রার পরিবর্তন যে কোনও নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ। সেই নির্বাচনে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের মধ্যে ভোট-শেয়ারের পার্থক্য ছিল প্রায় ১০ শতাংশ। যদি ভোটার তালিকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নাম বাদ পড়ে এবং তার প্রভাব নির্দিষ্ট এলাকায় বেশি পড়ে, তবে সেই ব্যবধান কমে আসতে পারে বলেই মনে করছেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।
পদ্ম শিবিরের বক্তব্য, ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ গণতন্ত্রের স্বার্থে জরুরি এবং এতে “ভোটব্যাঙ্ক রাজনীতি” দুর্বল হবে। অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, SIR-এর নামে প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চলছে এবং এর প্রভাব পড়বে প্রান্তিক ও সংখ্যালঘু ভোটারদের উপর।
রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠছে এই পরিস্থিতিতে কি বাংলা আরও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের দিকে এগোচ্ছে? একদল বিশেষজ্ঞের মতে, ভোটার তালিকার এই রদবদল নির্বাচনের অঙ্ককে নতুন করে সাজিয়ে দিতে পারে। আবার অন্যদের মতে, মাঠের সংগঠন, প্রার্থী নির্বাচন ও প্রচারের জোরই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণ করবে।
সব মিলিয়ে, SIR শুধুই একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয় এটি এখন বাংলার রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। ভোটার তালিকার চূড়ান্ত ছবি কী দাঁড়ায় এবং তার প্রভাব কোন দিকে যায়, তার উপরই নির্ভর করবে বিধানসভা নির্বাচনের ভবিষ্যৎ সমীকরণ। একথা নিশ্চিত, রাজ্য রাজনীতি একটি কঠিন ও টানটান লড়াইয়ের দিকেই এগোচ্ছে।
