কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন যত এগোচ্ছে, (Joy Goswami)ততই তীব্র হচ্ছে ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা SIR ঘিরে বিতর্ক। প্রবীণ নাগরিক থেকে শুরু করে বহু পরিচিত নামকে শুনানিতে ডাকার ঘটনায় ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক উত্তাপ চরমে। সেই আবহেই এবার SIR-শুনানিতে ডেকে পাঠানো হল বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামীকে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসতেই ক্ষোভ, প্রশ্ন ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় সরগরম রাজ্য রাজনীতি।
পরিবারের দাবি অনুযায়ী, আগামী ২ জানুয়ারি SIR-শুনানিতে হাজির হতে বলা হয়েছে কবি জয় গোস্বামীকে। শুধু তাই নয়, শুনানির নোটিস পাঠানো হয়েছে তাঁর মেয়েকেও। তবে সমস্যা হল, জয় গোস্বামী বর্তমানে অসুস্থ। কয়েক দিন আগেই তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে। চিকিৎসকদের কড়া নির্দেশ অনুযায়ী, এখন বাড়ি থেকে বেরনো তো দূরের কথা, বেশি কথা বলাও নিষেধ। এই অবস্থায় তাঁকে শুনানিতে ডাকার ঘটনায় প্রবল ক্ষুব্ধ পরিবার।
সযত্নে বাবরি প্রসঙ্গ এড়ালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
জয়ের মেয়ে সংবাদমাধ্যমে জানান, BLO মারফত তাঁর মায়ের কাছে ফোন আসে। সেখানে জানানো হয়, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় জয় গোস্বামীর নাম না থাকায়, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত নথি নিয়ে তাঁদের SIR-শুনানিতে হাজির হতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে ২০২৪ সালেও জয় গোস্বামী এবং তাঁর কন্যা ভোট দিয়েছেন। বহু বছর ধরেই নিয়মিত ভোটার তাঁরা। তা হলে এত বছর পরে কেন নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে?
জয় গোস্বামীর জন্ম কলকাতার শিশুমঙ্গল এলাকায়। শৈশব কেটেছে নদিয়ার রানাঘাটে। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে তিনি কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতি সর্বজনবিদিত। পরিবারের প্রশ্ন, এই পরিচয় এবং এত বছরের ভোটার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে শুনানিতে ডেকে প্রমাণ দিতে হবে?
জয়ের মেয়ে বলেন, “২০০২ সালে বাবার কোনও নথি নেই বলা হচ্ছে। সেই সময় আমি নাবালক ছিলাম, তাই আমার নামও ছিল না। কিন্তু তার পর থেকে বাবা একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। শেষ লোকসভা নির্বাচনেও ভোট দিয়েছেন। তা হলে এখন কেন এই হয়রানি? অসুস্থ অবস্থায় বাবাকে ডেকে এনে হেনস্থা করা হচ্ছে।”
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের তরফেও কড়া প্রতিক্রিয়া এসেছে। শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু বলেন, “জয় গোস্বামীকে যদি SIR-শুনানিতে ডাকা হয়, তাহলে আমার মনে হয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেঁচে থাকলেও তাঁকেও লাইনে দাঁড় করানো হত। এটা বাংলা ও বাঙালির প্রতি ওদের মানসিকতার পরিচয়।” তাঁর অভিযোগ, বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের এই প্রক্রিয়া বাংলার সংস্কৃতি ও পরিচিত মুখদেরও ‘অনুপ্রবেশকারী’ তকমা দেওয়ার রাস্তা খুলে দিচ্ছে।
বিরোধীদের দাবি, SIR-এর নামে পরিকল্পিতভাবে ভয় ও বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে। প্রবীণ মানুষ, অসুস্থ নাগরিকদের শুনানিতে ডেকে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। শাসকদলের মতে, ভোটের আগে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে অস্থিরতা তৈরি করাই এর উদ্দেশ্য।
এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠছে ভোটার তালিকার সংশোধন কি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, না কি রাজনৈতিক হাতিয়ার? একজন প্রতিষ্ঠিত কবি, যিনি আজীবন এ রাজ্যে থেকেছেন, নিয়মিত ভোট দিয়েছেন, তাঁকেও যদি নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হয়, তা হলে সাধারণ মানুষের অবস্থান কোথায় দাঁড়ায়? SIR-শুনানিতে জয় গোস্বামীকে ডাকা শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং তা ঘিরে বাংলার রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিল।
