
কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ: রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দানে ফের ধর্মকেন্দ্রিক বিতর্ক উসকে দিলেন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ও জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রাক্তন প্রার্থী নিশা চট্টোপাধ্যায় (Nisha Chattopadhyay)। দলের প্রধান হুমায়ুন কবীরকে সরাসরি আক্রমণ করে তিনি অভিযোগ তুলেছেন, ধর্মের ভিত্তিতে রাজনীতি করে হিন্দু-মুসলিম বিভাজন উসকে দিচ্ছেন ওই নেতা। নিশার বক্তব্যকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শোরগোল পড়েছে রাজ্য রাজনীতিতে, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনের প্রাক্কালে।
নিশা চট্টোপাধ্যায় এক বিবৃতিতে বলেন, হুমায়ুন কবীর তাঁকে উদ্দেশ্য করে যেভাবে মন্তব্য করেছেন, তা শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতিরই প্রতিফলন। নিশার দাবি, “তিনি বলছেন আমি একজন সোশ্যাল মিডিয়ার অভিনেত্রী, হ্যাঁ আমি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই রোজগার করি। বহু বছর ধরে নিজের কাজ ও জীবনযাপনের মাধ্যমে ফলোয়ার তৈরি করেছি। হঠাৎ করেই তিনি আমার নাম প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করলেন, আবার পরে মত বদলে নিলেন।”
#WATCH | Kolkata, West Bengal: Nisha Chatterjee, Social Media Influencer & Janata Unnayan Party candidate says, "He is saying that I am an actress who belongs to social media. Yes, I earn through social media. I live my life by showcasing my lifestyle; I've been building this fan… https://t.co/mAhbNcFQPN pic.twitter.com/2hmjtwFH7e
— ANI (@ANI) December 24, 2025
নিশার অভিযোগ, তাঁর নাম ঘোষণা এবং পরে প্রত্যাহারের পেছনে আসল কারণ ছিল ধর্মের প্রশ্ন। তিনি বলেন, “উনি হিন্দু-মুসলিম ইস্যু তৈরি করেছেন। যাকে আমি সমর্থন করছিলাম, তিনি নাকি নিজের ধর্মের লোকদেরও সমর্থন করেন না। তাহলে আমি কেন তাঁকে সমর্থন করব? তিনি এমন কথাও বলেছেন যে হিন্দুদের কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন—এমন কথা কি বলা যায়?” যদিও এই বক্তব্য নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে নিশা বলেন, তিনি নিজে একজন হিন্দু হলেও তাঁর চারপাশে মুসলিম ভাই-বোনেরা রয়েছেন এবং সকলের সঙ্গে মিলেমিশে সমাজসেবার কাজ করেন। তাঁর কথায়, “আমাকে বলা হয়েছিল, এটা একটা ধর্মনিরপেক্ষ দল। এখানে হিন্দু-মুসলিম কোনও ভেদাভেদ নেই। সেই বিশ্বাস থেকেই আমি এই দলে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন দলের প্রধান নিজেই বলছেন, তিনি শুধু মুসলিমদের জন্য কাজ করেন। এতে তো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।”
নিশার আরও অভিযোগ, হুমায়ুন কবীর মুসলিম সমাজের আবেগকে ব্যবহার করছেন বাবরি মসজিদের মতো সংবেদনশীল ইস্যু তুলে ধরে। তাঁর মতে, এতে সমাজে বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে এবং রাজনীতির মানও নিচে নামছে। “ধর্মের নামে মানুষকে ভাগ করে ভোট চাইলে তাতে সমাজের ক্ষতিই হয়,” বলেন তিনি।
অন্যদিকে, এই বিতর্কের মাঝেই জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। কলকাতায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, “বালিগঞ্জে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৪৯ শতাংশ। সেই কারণেই সেখানে একজন মুসলিম পুলিশ অফিসার হাসানকে প্রার্থী করেছি। আমি সব আসনে প্রার্থী ঘোষণা করব। বিজেপি ও তৃণমূল—দু’দলকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে নির্বাচন লড়ব।”
নিশা চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী না করার বিষয়ে হুমায়ুন কবীর স্পষ্ট করে বলেন, এটি ধর্মের কারণে নয়। তাঁর দাবি, “নিশার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল, যার ফলে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছিল। সেই কারণেই তাঁকে প্রার্থী করা হয়নি। তিনি হিন্দু বলেই বাদ পড়েছেন—এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভুল।” একইসঙ্গে তিনি জানান, তাঁর দলে বহু হিন্দু প্রার্থী থাকবেন। মোট ২০০টি আসনের মধ্যে প্রায় ৯০টি আসনে মুসলিম এবং বাকি ১১০টি আসনে হিন্দু প্রার্থীদের টিকিট দেওয়া হবে।
হুমায়ুন কবীর আরও বলেন, তাঁর দল সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ এবং সকল সম্প্রদায়কে নিয়ে এগোতে চায়। “আমার দলে হিন্দুদের জন্য জায়গা নেই—এমন কথা বলা সম্পূর্ণ অপপ্রচার,” দাবি করেন তিনি।
তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, নিশা চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ এবং হুমায়ুন কবীরের পাল্টা ব্যাখ্যা—দু’পক্ষের বক্তব্যই নির্বাচনের আগে ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া বাড়ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ছোট ও নতুন দলগুলির ক্ষেত্রে পরিচিত মুখ ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রভাবশালীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, ধর্ম সংক্রান্ত মন্তব্য সেই কৌশলকে বিপরীত দিকে নিয়ে যেতে পারে। নিশা চট্টোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য ক্ষোভ এবং হুমায়ুন কবীরের ব্যাখ্যা—দুটিই আগামী দিনে জনতা উন্নয়ন পার্টির ভাবমূর্তিতে কী প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।










