
কলকাতার অভিজাত ক্যালকাটা ক্লাবে আয়োজিত ‘দ্য ডিবেট ২০২৬’ মঞ্চে হিন্দুত্ব ও (Mahua Moitra)হিন্দুধর্ম নিয়ে তীব্র ও স্পষ্ট মন্তব্য করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র। ভিনধর্মে বিয়ে, ধর্মীয় সহনশীলতা এবং রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদ এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তাঁর বক্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোড়ন ফেলেছে। মহুয়ার দাবি, সাধারণ হিন্দু সমাজ ভিনধর্মে বিয়ে নিয়ে ততটা আপত্তিকর নয়, যতটা আপত্তি তোলে তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। তাঁদের কাছেই প্রেম পরিণত হয় ‘লাভ জিহাদ’-এর অভিযোগে।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মহুয়া মৈত্র বলেন, হিন্দুত্ব এবং হিন্দুধর্ম এক জিনিস নয়। তাঁর কথায়, “হিন্দুত্ব একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং বলে আমরাই একমাত্র পথ। কিন্তু হিন্দুধর্ম একটি ধর্ম ও আধ্যাত্মিক পথ হিসেবে বরাবরই বহুত্ববাদী।
বিবাহিতা মহিলাকে অপহরণ-শারীরিক হেনস্থা! পুলিশের জালে জুনাইদ
এখানে অনেক পথ, অনেক বিশ্বাসের সহাবস্থান সম্ভব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন হিন্দু ধর্মাচারী সহজেই একজন মুসলিমের সঙ্গে প্রেম বা বিয়ের কথা কল্পনা করতে পারেন। কিন্তু একজন হিন্দুত্ববাদী সেই সম্পর্ককে সঙ্গে সঙ্গে ‘লাভ জিহাদ’ বলে দাগিয়ে দেবেন।
মহুয়ার বক্তব্যে উঠে আসে খাদ্যাভ্যাস ও আচার নিয়েও বিতর্ক। তিনি বলেন, “একজন বাঙালি হিন্দু নির্দ্বিধায় মাংস খান এবং মা কালীর পুজোতেও মাংস ভোগ দেন। কিন্তু হিন্দুত্ববাদী মানসিকতা বলবে এটা ঠিক নয়।” তাঁর মতে, এই মানসিকতা হিন্দুধর্মের ঐতিহাসিক বৈচিত্র্য ও আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে অস্বীকার করে। হিন্দুধর্মের ভিতরে যে বহুরূপতা, বিভিন্ন আচার, খাদ্যাভ্যাস ও বিশ্বাসের সহাবস্থান রয়েছে হিন্দুত্ববাদ সেই জায়গাটাকেই সংকুচিত করতে চায়।
এই প্রসঙ্গে মহুয়া মৈত্র একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন “হিন্দুধর্ম কি হিন্দুত্ব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে চায়?” তাঁর নিজের উত্তরে তিনি বলেন, হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার সবচেয়ে ভালো উপায় হল এটা বোঝা যে, হিন্দুত্বের অস্তিত্বই হিন্দুধর্মের কারণে। অর্থাৎ হিন্দুধর্মের উদারতা, সহনশীলতা ও বহুত্ববাদের মধ্যেই হিন্দুত্বের জন্ম, কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সেই ধর্মকেই সংকীর্ণ করে তোলার চেষ্টা চলছে।
মহুয়ার এই বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থকদের মতে, তিনি হিন্দুধর্ম ও হিন্দুত্বের পার্থক্য স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন এবং ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করার প্রবণতার বিরুদ্ধে যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, ভিনধর্মে বিয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্ককে ‘লাভ জিহাদ’ আখ্যা দেওয়া আসলে সমাজে বিভাজন তৈরি করার একটি কৌশল।
অন্যদিকে, বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির সমর্থকদের একাংশ মহুয়ার মন্তব্যকে “হিন্দুত্ব বিরোধী” বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, লাভ জিহাদের অভিযোগ নিছক রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং একটি সামাজিক বাস্তবতা, যা নিয়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তাঁরা মনে করছেন, মহুয়া মৈত্র হিন্দুত্বকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছেন এবং হিন্দু সমাজের উদ্বেগকে খাটো করে দেখছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহুয়ার বক্তব্য আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। একদিকে বিজেপি যেখানে হিন্দুত্বকে রাজনৈতিক পরিচয়ের কেন্দ্রে রেখেছে, অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের পক্ষের দল হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। সেই লড়াইয়ের ময়দানেই হিন্দু বনাম হিন্দুত্বের এই বিতর্ক নতুন করে সামনে এল।
সব মিলিয়ে, ভিনধর্মে বিয়ে, খাদ্যাভ্যাস ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মহুয়া মৈত্রের মন্তব্য শুধু একটি বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের অংশ, যেখানে প্রশ্ন উঠছে হিন্দুধর্মের বহুত্ববাদী আত্মা কি রাজনৈতিক হিন্দুত্বের চাপে ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, নাকি এই বিতর্কই ভারতীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রকাশ? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখন মুখোমুখি দুই ভিন্ন ভাবধারা।










