রাজ চক্রবর্তী বাংলার কলঙ্ক, বিস্ফোরক কৌশিক মাইতি

মুক্তির আগেই তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর নতুন ছবি ‘হোক কলরব’ (Hoak Kolorob controversy)। ছবির টিজার প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে প্রবল…

Hoak Kolorob-controversy-raj-chakraborty-kaushik-maiti-criticizes

মুক্তির আগেই তীব্র বিতর্কে জড়িয়ে পড়ল পরিচালক রাজ চক্রবর্তীর নতুন ছবি ‘হোক কলরব’ (Hoak Kolorob controversy)। ছবির টিজার প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে প্রবল সমালোচনা ও ক্ষোভ। বিশেষ করে অভিনেতা শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়ের বলা একটি সংলাপ ঘিরেই উত্তাল নেটদুনিয়া। অনেকের অভিযোগ, ওই সংলাপ বাঙালির ইতিহাস, আবেগ এবং বিপ্লবী ঐতিহ্যকে আঘাত করেছে। এই প্রেক্ষিতেই বাংলাপক্ষের শীর্ষ নেতা কৌশিক মাইতি কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন রাজ চক্রবর্তীকে। তাঁর মন্তব্য, “রাজ চক্রবর্তী বাংলার কলঙ্ক”—এই কথাই এখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

Advertisements

টিজারে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কে একজন আইপিএস অফিসারের ভূমিকায় দেখা গিয়েছে। তাঁর চরিত্রের নাম রাখা হয়েছে ‘ক্ষুদিরাম চাকী’। একটি দৃশ্যে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “নমস্কার, আমি ক্ষুদিরাম চাকী। না, আমি ঝুলি না, ঝোলাই!” এই সংলাপ প্রকাশ্যে আসতেই বিতর্ক দানা বাঁধে। নেটিজেনদের একাংশের দাবি, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীর নামের সঙ্গে এ ধরনের শব্দখেলা বা রসিকতা চরম অসম্মানজনক। দেশের স্বাধীনতার জন্য যাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগকে এভাবে হালকা করা যায় না বলেই মত অনেকের।

   

বিশেষ করে বাঙালি সমাজে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীর নাম আবেগ, গর্ব ও আত্মত্যাগের প্রতীক। মাত্র আঠারো বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির মঞ্চে উঠে যাওয়া ক্ষুদিরাম বসু আজও বাঙালির চেতনায় বিপ্লবের প্রতিচ্ছবি। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিকে কেন্দ্র করে কোনও রকম ‘চটুল’ বা ‘রগরগে’ সংলাপ কেন ব্যবহার করা হবে—এই প্রশ্ন তুলছেন সমালোচকেরা। তাঁদের মতে, সিনেমার স্বাধীনতার অজুহাতে ইতিহাস ও শহিদদের প্রতি দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ মেনে নেওয়া যায় না।

টিজার প্রকাশের পর থেকেই ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন বহু দর্শক। শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়কেও সরাসরি কাঠগড়ায় তুলেছেন অনেকে। কেউ কেউ তাঁর আগের কাজের প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন—তিনি কি সংলাপের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রভাব না ভেবেই এমন চরিত্রে অভিনয় করেন? আবার কেউ কেউ বলেছেন, একজন অভিজ্ঞ অভিনেতার কাছ থেকে এমন অসংবেদনশীল সংলাপ প্রত্যাশিত নয়।

এই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাজনৈতিক যোগসূত্র। ছবির পরিচালক রাজ চক্রবর্তী ব্যারাকপুরের তৃণমূল বিধায়ক এবং ছবিতে অভিনয় করছেন একই কেন্দ্রের তৃণমূল সাংসদ পার্থ ভৌমিক। ফলে প্রশ্ন উঠছে, শাসকদলের জনপ্রতিনিধিরা যুক্ত বলেই কি বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মহলের বড় অংশ নীরব? বিরোধী শিবিরের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের একাংশও প্রশ্ন তুলছেন—যদি এমন বিতর্ক কোনও অন্য নির্মাতার ছবিকে ঘিরে হতো, তবে কি প্রতিক্রিয়া এতটাই সংযত থাকত?

এই পরিস্থিতিতে সরব হয়েছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি স্বাভিমান রক্ষার দাবিতে সক্রিয় সংগঠন বাংলাপক্ষ। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক কৌশিক মাইতি ফেসবুকে একাধিক পোস্টে তীব্র ভাষায় আক্রমণ শানিয়েছেন রাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার রাতে করা এক পোস্টে তিনি লেখেন,
“রাজ চক্রবর্তী বাংলার কলঙ্ক। নির্লজ্জ লোক একটা। ‘ক্ষুদিরাম চাকী’ নামের চরিত্র বানিয়ে বীর বাঙালি ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে অপমান করেছে। কা ন ধরে বাঙালির কাছে ক্ষমা চাক রাজ চক্রবর্তী।”

এর আগেও একই দিনে সকালে তিনি আরও একটি পোস্টে লেখেন, “ক্ষুদিরাম চাকী বলে কিছু হয় না। বাঙালি বীর ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকীকে নিয়ে কোনো ছেলেখেলা নয়। রাজ চক্রবর্তী তোমার লজ্জা হয় না? এসব বন্ধ করো, এসব বাংলায় চলবে না।”

কৌশিক মাইতির এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। সমর্থকদের একাংশ তাঁর বক্তব্যকে সমর্থন করে বলছেন, ইতিহাস ও শহিদদের সম্মান রক্ষা করা সমাজের দায়িত্ব। আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, সিনেমার গল্প ও চরিত্র পুরোটা না দেখে এমন প্রতিবাদ কতটা যুক্তিসঙ্গত। তবে বিরোধীদের পাল্টা যুক্তি, টিজারই যদি আপত্তিকর হয়, তাহলে পূর্ণ ছবিতে সেই মনোভাব বদলাবে—এমন আশা করা কঠিন।

সব মিলিয়ে ‘হোক কলরব’ মুক্তির আগেই যে বড়সড় বিতর্কের মুখে পড়েছে, তা স্পষ্ট। একদিকে শিল্পীর স্বাধীনতা বনাম ঐতিহাসিক সংবেদনশীলতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক পরিচয় ও দায়িত্ব—এই সব প্রশ্ন মিলিয়ে বিষয়টি এখন শুধুই একটি সিনেমার বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। রাজ চক্রবর্তী বা ছবির নির্মাতারা এই বিতর্কে কী ব্যাখ্যা দেন কিংবা ক্ষমা চান কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র মহল ও সাধারণ দর্শক।

Advertisements