
কলকাতা: রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে মানুষের জন্য কী কী করেছে, (CV Ananda Bose)কোন পরিষেবা দিয়েছে তার বিস্তারিত হিসেব পেশ করা নতুন কিছু নয়। কিন্তু কোনও রাজ্যপাল যে নিজে তাঁর কাজের ‘রিপোর্ট কার্ড’ প্রকাশ করবেন, এমন নজির রাজনীতির ইতিহাসে বিরল।
সেই বিরল দৃষ্টান্তই স্থাপন করলেন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। শনিবার রাতে রাজভবনের লোকভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হল ‘রাজ্যপালের রিপোর্ট কার্ড’, যেখানে গত তিন বছরে বাংলার মানুষের জন্য তাঁর নেওয়া নানা পদক্ষেপের বিস্তারিত তালিকা তুলে ধরা হয়েছে।
জুয়েল রানা নিয়ে অধীরের মন্তব্যে বিস্ফোরক জবাব সুকান্তর
নিজেকে বারবার ‘অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে তুলে ধরলেও, রাজ্যপালের এই রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ ঘিরে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর চর্চা। কারণ, এই রিপোর্ট কার্ডে শুধু সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের কথা নয়, বরং উন্নয়ন, সমাজকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি থেকে শুরু করে অর্থনৈতিক সহায়তার মতো একাধিক ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ রূপরেখা স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। এই রিপোর্ট কার্ডের মূল শিরোনাম ‘শান্তি-শুদ্ধি-সমৃদ্ধি: বিকশিত বাংলার রূপরেখা’। মোট ১১টি মিশনের মাধ্যমে বাংলাকে একটি উন্নত, স্বনির্ভর ও সামাজিকভাবে সংহত রাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ‘মিশন বন্দে মাতরম’। এর আওতায় গ্রাম উন্নয়ন, যুব সমাজকে সংগঠিত করা, ডিজিটাল শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা, নারী ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। ‘বন্দে মাতরম গ্রাম সমৃদ্ধি মিশন’-এর লক্ষ্য গ্রামগুলিকে পরিবেশবান্ধব ও স্বনির্ভর করে তোলা। পাশাপাশি যুবকদের নিয়ে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে ‘বন্দে মাতরম যুব কর্পস’, যারা দুর্যোগ মোকাবিলা থেকে সমাজসেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও একাধিক উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। দুর্গম এলাকায় পৌঁছনোর জন্য ডিজিটাল ভ্রাম্যমাণ শ্রেণিকক্ষ, বিনামূল্যের স্বাস্থ্য শিবির, ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল এবং প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকল্পনা রয়েছে রিপোর্ট কার্ডে।
রাজ্যপালের রিপোর্ট কার্ডে উল্লেখযোগ্য আরেকটি দিক হল কৃষি ও গ্রাম উন্নয়ন। ‘আমার মাটি, আমার চাষি’ মিশনের মাধ্যমে আধুনিক ও জৈব কৃষিকে উৎসাহিত করা, কৃষকদের আয় বাড়ানো এবং প্রযুক্তি নির্ভর কৃষি বিপণন ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘আমার গ্রাম, আমার গর্ব’ মিশনে গ্রামভিত্তিক প্রশাসনিক শিবির, বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরি এবং দরিদ্র পরিবারের জন্য সম্মানজনক কমিউনিটি বিবাহের মতো উদ্যোগের প্রস্তাব রয়েছে।
পর্যটন, পরিবহণ, নগরায়ণ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বড়সড় পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। ‘দ্য গ্রেট বাংলা ট্রেল’-এর মাধ্যমে রাজ্যের পর্যটনকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যাওয়ার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, সর্বজনীন ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত অংশ হল সরাসরি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি। বিধবা ও পরিত্যক্ত নারীদের জন্য ‘বোনেদের বোনাস’, শিশুদের জন্য ‘ছোটদের শক্তি কার্ড’, আদিবাসী ও তফসিলি জাতির জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা, প্রবীণ নাগরিকদের পেনশন বৃদ্ধি, যুবকদের স্টার্ট-আপ তহবিল এমন একাধিক প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই রিপোর্ট কার্ড প্রকাশ শুধু রাজ্যপালের কাজের হিসেব নয়, বরং বাংলার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের বিকল্প রূপরেখা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই এই উদ্যোগ ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক ও চর্চার সূচনা হয়েছে।










