২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের (Assembly election 2026) আগে রাজ্যের রাজনৈতিক ময়দান ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। মঙ্গলবার সেই উত্তাপ আরও চরমে পৌঁছাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকাশ্য বাক্যবাণে। ভোটের আগে SIR বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন এবং অবৈধ অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দু’পক্ষের সংঘাত রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
তিন দিনের সফরে পশ্চিমবঙ্গে এসে অমিত শাহ সরাসরি তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানান। তাঁর অভিযোগ, গত ১৫ বছরে বাংলায় ভয়, দুর্নীতি এবং কুশাসনের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেস ভোটব্যাঙ্ক রক্ষার স্বার্থে ‘ঘুসপৈঠিয়া’ সমস্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছে।
অমিত শাহ আরও বলেন, বাংলাদেশ সীমান্তে নিরাপত্তা জোরদার করতে বিএসএফ-এর জন্য পর্যাপ্ত জমি বরাদ্দ চেয়ে তিনি একাধিকবার রাজ্য সরকারকে চিঠি পাঠালেও কোনও সাড়া মেলেনি। তাঁর বক্তব্য, অনুপ্রবেশের কারণে রাজ্যের জনসংখ্যাগত কাঠামো বদলে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে বাংলার সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সাংবাদিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, বিজেপি কখনও এমন কোনও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমঝোতা করবে না যারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের প্রশ্রয় দেয় এবং তাদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করে। তাঁর দাবি, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে বিজেপি কোনও আপস করবে না।
অমিত শাহের এই বক্তব্যের পাল্টা জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তীব্র ভাষায় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘মহাভারতের দুষ্শাসন’ বলে কটাক্ষ করেন। একইসঙ্গে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া নিয়ে কেন্দ্র ও বিজেপির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, SIR-এর অজুহাতে প্রায় দেড় কোটি বৈধ ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রক্রিয়ার অতিরিক্ত চাপের ফলে প্রায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাঁদের মধ্যে বহু বুথ লেভেল অফিসারও রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, যদি একজন বৈধ ভোটারের নামও বাদ যায়, তাহলে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের দফতর ঘেরাও করবে।
সীমান্তে জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত অভিযোগও নস্যাৎ করে দেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সব জমি রাজ্য সরকারই দিয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি জমি না দিতাম, তাহলে বাংলায় কয়লা উত্তোলন বা অন্যান্য কেন্দ্রীয় প্রকল্প কীভাবে হচ্ছে?”
অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে কেন্দ্রকে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই কি অনুপ্রবেশ হচ্ছে? কাশ্মীর বা অন্য রাজ্যে নেই? তাহলে পহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা বা দিল্লির বিস্ফোরণ কীভাবে ঘটল? তাঁর এই মন্তব্যে কেন্দ্রীয় সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, SIR ও অনুপ্রবেশ ইস্যু আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠবে। বিজেপি যেখানে জাতীয় নিরাপত্তা ও ভোটার তালিকার স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলছে, সেখানে তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করছে, কেন্দ্র গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছে। সব মিলিয়ে ভোটের আগে বাংলার রাজনীতিতে সংঘাত আরও তীব্র হওয়াই নিশ্চিত।
