বুধবার নির্বাচন কমিশনের CEC জ্ঞানেশ কুমার বৈঠকের শেষে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) একটি গুরুতর প্রশ্ন তুললেন। তিনি জানতে চাইলেন, “এসআইআর সংক্রান্ত সমস্ত নোটিস কেন হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে? কেন কোনও লিখিত নির্দেশিকা দেওয়া হচ্ছে না?” তৃণমূলের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রশ্ন তুলে নির্বাচন কমিশনের কার্যপ্রণালীর উপর এক ধরণের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
এই নিয়ে অভিষেক বলেন, “নির্বাচন কমিশন কীভাবে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সরকারি নির্দেশ পাঠাচ্ছে? এটি কোন ধরনের প্রথা বা নীতি? কেন্দ্র কি আগামীতে সমস্ত সরকারি নির্দেশ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠাতে চায়?” তার অভিযোগ, যে কোনো সরকারি নির্দেশিকা বা সার্কুলার একটি যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে প্রকাশিত হওয়া উচিত, যেখানে সব দিক পরিষ্কার থাকে। কিন্তু, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এমন একটি গোপন এবং অস্বাভাবিক মাধ্যমের ব্যবহার রাজনৈতিক মহলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
বৈঠকের শেষে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক সাংবাদিক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “নির্বাচন কমিশন এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা, যার ওপর জনগণের আস্থা থাকা উচিত। কিন্তু যখন সেই সংস্থা কোনো সরকারি নির্দেশ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে পাঠাবে, তখন জনসাধারণের মনে প্রশ্ন উঠতে পারে। এটি কি কোনও বেসরকারি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে একটি সরকারি নির্দেশ প্রচারের পদ্ধতি হতে পারে?”
অভিষেক তার বক্তব্যে আরও বলেন, এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়টি ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্কের সাথে সংযুক্ত। তিনি বলেন, ভোটার তালিকায় কীভাবে অনিয়ম হচ্ছে, ভোট চুরি হচ্ছে এবং এসব বিষয় কীভাবে নির্বাচন কমিশন দেখে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি বিশেষ করে ভোটার তালিকা পর্যালোচনার সময় কিছু ভুল তথ্য এবং মনগড়া এন্ট্রির ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বৈঠকের পর অভিষেক দাবি করেন যে নির্বাচন কমিশন কোনো লিখিত বা ফরমানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করে, এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলির নির্দেশ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে প্রেরণ করা এক ধরনের দুর্বলতার পরিচয়। ভোটের সময় ভোটারদের অধিকারের উপর যদি এভাবে প্রভাব পড়ে, তবে তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে কোন অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম জনগণের আস্থা কমাতে পারে।
এছাড়া অভিষেক প্রশ্ন তুলেন, “নির্বাচন কমিশন কি নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য কাজ করছে, নাকি এটি সরকারের নির্দেশ অনুসরণ করছে?” তার অভিযোগ, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সরকারি নির্দেশ পাঠানোর পদ্ধতি সরকারের পক্ষ থেকে পরিকল্পিত একটি চাপ সৃষ্টি করার অংশ হতে পারে। অভিষেক আরও বলেন, “নির্বাচন কমিশন যেহেতু একটি সাংবিধানিক সংস্থা, সেহেতু এর কাজের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যখন কোনও প্রক্রিয়া গোপনীয়তায় পূর্ণ হয়ে যায়, তখন তা সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে।” এছাড়া অভিষেক এই বৈঠকে অন্যান্য প্রসঙ্গেও আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “এ ধরনের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে, এবং ভোটারদের কাছে অস্পষ্টতা তৈরি করতে পারে।” তিনি দাবি করেন, সরকারের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে এক ধরনের হস্তক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, যা গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বাসের ক্ষতি করতে পারে।
অভিষেকের এই প্রশ্নের পর নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে, নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে যে, হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত ও কার্যকরী যোগাযোগের জন্য কিছু নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছে, যা সঠিক সময়ে নির্বাচনী কাজগুলি পরিচালনা করতে সাহায্য করছে। তবে, এটি সাধারণত সরকারি নির্দেশিকা হিসেবে গণ্য হতে পারে না, এবং এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে না—এমন বক্তব্যও এসেছে।
যতই নির্বাচন কমিশন এর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করুক, জনগণের মনে প্রশ্ন উঠেছে এই নতুন পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে। এখন দেখার বিষয় হল, নির্বাচন কমিশন কি তাদের এই অনানুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলি পুনরায় মূল্যায়ন করবে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য আরও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গ্রহণ করবে। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশ্ন এবং অভিযোগ ভোটারদের অধিকার এবং নির্বাচনের শুদ্ধতার পক্ষে একটি বড় ধরনের আস্থার সংকটের ইঙ্গিত হতে পারে। এবার সময় এসেছে, নির্বাচন কমিশন নিজের প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরও স্পষ্টতা এবং প্রতিকার প্রদান করবে কিনা, সেটি দেখার।
