
দার্জিলিঙে শীতের সন্ধ্যা মানেই ম্যাল রোডে ভিড়, আর মাঝেই লাল রঙের উজ্জ্বল হরফে লেখা ‘HOPE’। তার সামনে দাঁড়িয়ে ছবি না তুলে ফেরেন, এমন পর্যটক দুষ্কর। সেই ছবি-তোলার ব্যাকড্রপের পাশেই গ্লেনারিজের দোতলায় গরম পানীয় হাতে লাইভ মিউজিকের সঙ্গে বসে থাকা শহরের চেনা দৃশ্য। কিন্তু সেই ছবি আর দেখা যাবে না। ঐতিহ্যবাহী গ্লেনারিজ বারের দরজায় পড়েছে তালা। আবগারি দফতর সাসপেন্ড করেছে বার লাইসেন্স। আর তা সামনে আসতেই পাহাড়ে শুরু হয়েছে প্রবল চর্চা।
হঠাৎ কেন বন্ধ হলো গ্লেনারিজ বার?
শহরের অন্যতম পুরনো এই বেকারি ও পানশালায় মঙ্গলবার পৌঁছয় আবগারি দফতরের একটি দল। দীর্ঘক্ষণ ধরে নথিপত্র পরীক্ষা ও জায়গা পরিদর্শনের পর কয়েকটি কাগজপত্র বাজেয়াপ্ত করে সিল করে দেওয়া হয় বার।
জেলাশাসক মণীশ মিশ্র জানিয়েছেন, বার চালানোর ক্ষেত্রে যে নিয়মকানুন মানা বাধ্যতামূলক, তার বেশ কয়েকটিই গ্লেনারিজে মানা হয়নি। পরিকাঠামোগত ত্রুটি ছাড়াও নিয়মমাফিক লাইভ মিউজিকের অনুমতিও নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। দার্জিলিঙের আবগারি সুপারিন্টেন্ডেন্ট গৌতম পাখরিনও অনিয়মের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মালিক অজয় এডওয়ার্ডের পালটা অভিযোগ: ‘এটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’
গ্লেনারিজের মালিক এবং ইন্ডিয়ান গোরখা জনশক্তি ফ্রন্টের (IGJF) আহ্বায়ক অজয় এডওয়ার্ড এই অভিযানকে মোটেই প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন না। তাঁর দাবি, “বহুদিনের পুরনো এই বার, নতুন কিছু যুক্ত হয়নি। হঠাৎ অভিযান চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হল। এটা কাকতালীয় নয়।”
কেন?
সাম্প্রতিক রাজনীতি ঘিরেই তিনি অভিযোগ তুলেছেন। গত রবিবারই অজয় এডওয়ার্ডের উদ্যোগে জোড়বাংলো–সুখিয়াপোখরি ব্লকে তুংসুং নদীর উপর নির্মিত নতুন সেতুর উদ্বোধন হয়। সেতুটির নাম ‘গোর্খাল্যান্ড ব্রিজ’।
এই নামকরণকে ঘিরেই শুরু হয়েছে বিতর্ক। এবং ঠিক এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই গ্লেনারিজে পৌঁছে যায় আবগারি দফতর।
অজয়ের বক্তব্য, “গোর্খাল্যান্ড ব্রিজ শুধু পাথর-সিমেন্টের কাঠামো নয়, পাহাড়ের মানুষের আবেগ। তাই আমাকেই নিশানা করা হচ্ছে। এই কারণেই গ্লেনারিজ বারের লাইসেন্স সাসপেন্ড করা হয়েছে।”
তাহলে কি পুরো গ্লেনারিজ বন্ধ?
না, পুরো নয়। খোলা থাকছে বেকারি, স্ন্যাক্স কাউন্টার ও ক্যাফেটেরিয়া। বন্ধ থাকছে শুধুমাত্র দোতলার বার সেকশন। অর্থাৎ পর্যটকরা এখন গ্লেনারিজের দোতলার বারান্দা থেকে পাহাড়ের দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন না। থাকছে না লাইভ মিউজিক বা পানীয়ের আয়োজনও।
আবগারি দফতর জানিয়েছে, সমস্ত নিয়ম মেনে নতুন নথিপত্র জমা দিলে এবং ঘাটতি দূর করা হলে পুনরায় বার খোলার অনুমতি দেওয়া হবে।
পাহাড়ে এখন প্রশ্ন, আদৌ কি ফিরতে পারবে ‘গ্লেনারিজ বার’?
প্রশাসন ও মালিকপক্ষের মতবিরোধে আপাতত অনিশ্চয়তার আবহ। তবে গ্লেনারিজের জনপ্রিয়তা, ঐতিহ্য ও পর্যটন-নির্ভর অর্থনীতির বাস্তবতা মিলিয়ে পাহাড়বাসীর একটাই আশা, গ্লেনারিজ আবারও তার পুরনো ছন্দে ফিরুক।










