
কলকাতা: রাজ্যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়াকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন মাত্রা নিল। খসড়া ভোটার তালিকায় ৫৮ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ পড়ার পর বিজেপি সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনকালকে কাঠগড়ায় তুলেছে। গেরুয়া শিবিরের দাবি, এই সংশোধনী প্রক্রিয়ায় প্রকাশ্যে এসেছে দীর্ঘদিনের ‘ভোটার তালিকা কারচুপি’, যার জোরেই তৃণমূল কংগ্রেস এত বছর ক্ষমতায় টিকে ছিল।
বিজেপি নেতা অমিত মালব্য এক্স-এ একাধিক পোস্টে অভিযোগ করেছেন, এসআইআর-এর প্রাথমিক ফলাফলই প্রমাণ করে দেয় যে অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নামে পড়া ভোটের উপর দাঁড়িয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতায় ছিল। তাঁর বক্তব্য, প্রথম দফায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া প্রায় ৫৮ লক্ষ নামের বড় অংশ কলকাতা ও সংলগ্ন অঞ্চল থেকে—যে এলাকাগুলি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের ‘নির্ভরযোগ্য ভোটভিত্তি’ হিসেবে পরিচিত।
‘আনম্যাপড’ ভোটার এন্ট্রি
মালব্যর দাবি, “অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত ও ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম ব্যবহার করে অতীতে শাসক দলের পক্ষে ভোট পড়ত। সেই পথ এবার বন্ধ হয়েছে। এই নির্বাচনে প্রকৃত ভোটাররাই বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবেন, এবং তাঁরা জরাজীর্ণ ও ব্যর্থ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের অবসান ঘটাবেন।”
বিজেপির আরও অভিযোগ, এখনও প্রায় ৩০ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটার এন্ট্রি রয়েছে এবং অতিরিক্ত প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ নামের ক্ষেত্রে গুরুতর অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। এই ভোটারদের ক্ষেত্রেও আগামী দিনে নোটিস পাঠানো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মালব্য। তাঁর মন্তব্য, “এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের নামে পড়া ভোটের উপর ভর করেই এতদিন ক্ষমতায় ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এসআইআর সম্পূর্ণ হলে বাংলার রাজনৈতিক চিত্র আমূল বদলে যাবে।”
খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ
উল্লেখ্য, নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে। এর মধ্য দিয়েই এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথম পর্ব—গণনা ও চিহ্নিতকরণ—শেষ হয়েছে। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫৮,২০,৮৯৮ জন ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪,১৬,৮৫২ জন ভোটারকে মৃত হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। ১৯,৮৮,০৭৬ জন ভোটার স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত বা অন্যত্র চলে গিয়েছেন। আরও ১২,২০,০৩৮ জন ভোটারকে ‘নিখোঁজ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ডুপ্লিকেট, ভুয়ো বা জাল নামের সংখ্যা ১,৩৮,৩২৮। এছাড়াও অন্যান্য কারণে ৫৭,৬০৪টি নাম বাদ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। কমিশন জানিয়েছে, যাঁদের নাম খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁরা প্রয়োজনীয় নথি সহ ফর্ম ৬ জমা দিয়ে দাবি ও আপত্তি জানাতে পারবেন।
এসআইআর-এর দ্বিতীয় পর্ব
খসড়া তালিকা প্রকাশের পর শুরু হয়েছে এসআইআর-এর দ্বিতীয় পর্ব—দাবি, আপত্তি ও শুনানির প্রক্রিয়া। এই ধাপ চলবে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিন ধার্য করা হয়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। তার পরেই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিক ভাবে গতি পাবে।
অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুরু থেকেই এসআইআর প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে সরব। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন একযোগে ভোটার তালিকা নিয়ে কারচুপির মাধ্যমে বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে চাইছে। ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে এই রাজনৈতিক সংঘাত আগামী দিনে আরও তীব্র হবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।










