ডায়মন্ড হারবারের বাইরে এতদিন ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্প নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু সেই সীমারেখা ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েই রাজ্য রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। আর যে জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছে, তা নিছক কোনও এলাকা নয়, নন্দীগ্রাম। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র, যে কেন্দ্র একসময় বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নাটকীয় মোড় এনেছিল।
তৃণমূল সূত্রের খবর, জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে ‘সেবাশ্রয়’ শিবির চালু করার প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত। একাধিক দিন ধরে চলবে এই শিবির, যেখানে মূলত স্বাস্থ্য পরিষেবাকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের জন্য নানা সুবিধা দেওয়া হবে। এই কর্মসূচির সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি যুক্ত থাকার সম্ভাবনাই বেশি—কারণ, গোটা পরিকল্পনার নেপথ্য রূপকার তিনিই।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত শুধুই জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নয়, বরং সুস্পষ্ট রাজনৈতিক কৌশল। ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রাম ছিল তৃণমূলের কাছে সবচেয়ে সংবেদনশীল কেন্দ্র। মুখ্যমন্ত্রী সেখানে হেরে যাওয়ার পর যে প্রতীকী অভিঘাত তৈরি হয়েছিল, তার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। অভিষেকের এই পদক্ষেপ সেই অসম্পূর্ণ অঙ্ক মেলানোর প্রয়াস বলেই ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
তৃণমূল নেতৃত্বের একাংশের মতে, নন্দীগ্রামে এই শিবির চালু করে দুটি বার্তা দিতে চাওয়া হচ্ছে। প্রথমত, বিরোধী দলনেতার রাজনৈতিক দুর্গে গিয়ে সংগঠনের উপস্থিতি জোরালো করা। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষের কাছে বোঝানো—ভোটের ফল যাই হোক, পরিষেবার প্রশ্নে কোনও বিভাজন নেই। সরকার ও শাসকদল সকলের জন্যই কাজ করছে।
ডায়মন্ড হারবারে ‘সেবাশ্রয়’ প্রকল্প ইতিমধ্যেই পরিচিত নাম। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা তো বটেই, একসময় উত্তরবঙ্গ থেকেও মানুষ সেখানে চিকিৎসা পরিষেবা নিতে এসেছিলেন। সেই সাফল্যের পর প্রকল্পটিকে আরও বিস্তৃত করার ভাবনা যে তৈরি হবে, তা অনুমেয়ই ছিল। তবে নন্দীগ্রামকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে যে তাৎপর্যপূর্ণ, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তৃণমূলের অন্দরে অনেকেই বলছেন, শুধুমাত্র সংগঠন ঢেলে সাজিয়ে নন্দীগ্রামের মতো কেন্দ্রে প্রভাব ফেলা কঠিন। কোর কমিটি, দায়িত্ব বণ্টন—এসব প্রয়োজনীয় হলেও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করে না। সেখানে ‘সেবাশ্রয়’-এর মতো কর্মসূচি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব সুবিধা পৌঁছে দেয়, যা রাজনৈতিক মনোভাব গঠনে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
অতীতে এই প্রকল্প নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। বিরোধীরা একে কখনও ‘সমান্তরাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা’ বলে কটাক্ষ করেছে, কখনও রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার বলে আক্রমণ করেছে। এমনকি শাসকদলের মধ্যেও একসময় অস্বস্তি ছিল। তবে অভিষেক বরাবরই দাবি করেছেন, জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজের এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানো অপরাধ নয়।
নন্দীগ্রামে সেই মডেল প্রয়োগ হলে তার রাজনৈতিক অভিঘাত যে ডায়মন্ড হারবারের চেয়েও গভীর হবে, তা তৃণমূল নেতৃত্বের অনেকেই মানছেন। কারণ, এই কেন্দ্র শুধুই একটি বিধানসভা আসন নয়—এটি এক প্রতীক। আর সেই প্রতীকের মাটিতেই ‘সেবা’র মাধ্যমে রাজনৈতিক লড়াইয়ের নতুন অধ্যায় খুলতে চাইছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।


