নিজের বিধানসভা এলাকায় দলের “ঐতিহাসিক” সভায় আমন্ত্রণ না পাওয়া নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানালেন তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারি। হুগলির (Hooghly TMC) বলাগড় বিধানসভা কেন্দ্রের একতারপুরে দলের যে বড়সড় জনসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে দলের জেলার শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতি থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকার বিধায়ককে না জানানোয় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জোর আলোচনা।
ঘটনাটি সামনে আসে মনোরঞ্জন ব্যাপারির একটি ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। তিনি সেখানে লেখেন, বলাগড় এলাকার তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বর্তমানে বিধানসভার কনজুমার ও কো-অপারেটিভ কমিটির ট্যুরে উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলা সফরে রয়েছেন। সেই সময়েই তিনি জানতে পারেন, তার নিজের এলাকায় একতারপুরে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে তৃণমূল কংগ্রেসের একটি “ঐতিহাসিক” সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, সেই সভা সম্পর্কে তাকে আগাম কিছুই জানানো হয়নি।
ফেসবুক পোস্টে মনোরঞ্জন ব্যাপারি স্পষ্ট ভাষায় লেখেন, “কেউ জানালে হয়তো আমিও কমিটির ট্যুর বাতিল করে ওখানে পৌঁছে যাবার চেষ্টা করতাম।” এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট, সভার বিষয়ে অবগত থাকলে তিনি সেখানে উপস্থিত হতে আগ্রহী ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি এটাও উল্লেখ করেন, তিনি উপস্থিত থাকুন বা না থাকুন, হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে সভাটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় তিনি দলের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছেন।

একদিকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, অন্যদিকে ক্ষোভ—এই দুইয়ের মিশ্রণেই তাঁর পোস্টটি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, কোনও বিধায়কের নিজের এলাকায় দলের বড় সভা অনুষ্ঠিত হওয়া স্বাভাবিকভাবেই তাঁর রাজনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে জড়িত। অথচ সেই সভায় তাঁকে আমন্ত্রণ না জানানো বা অবহিত না করা দলের অন্দরের সমন্বয়হীনতার ইঙ্গিত বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দীর্ঘদিন ধরেই গোষ্ঠীকোন্দল ও অভ্যন্তরীণ মতভেদের অভিযোগ শোনা যায়। মনোরঞ্জন ব্যাপারি নিজেও অতীতে নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে খোলামেলা মন্তব্য করে দলের অন্দরমহলে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। তাঁর এই সাম্প্রতিক পোস্ট সেই ধারাবাহিকতাকেই আরও উসকে দিল বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে, জেলা স্তরের “তাবড় তাবড়” নেতাদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সভায় স্থানীয় বিধায়কের অনুপস্থিতি প্রশ্ন তুলছে, তবে কি ইচ্ছাকৃতভাবেই তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে?
যদিও প্রকাশ্যে দলের জেলা নেতৃত্ব বা রাজ্য নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে দলের অন্দর সূত্রে খবর, বিষয়টি নিয়ে অস্বস্তি রয়েছে। অনেকের মতে, বিধায়ককে না জানিয়ে এমন সভা আয়োজন রাজনৈতিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। আবার অন্য অংশের দাবি, সাংগঠনিক ব্যস্ততা বা প্রশাসনিক কারণে হয়তো যোগাযোগের ঘাটতি হয়েছে, এর পেছনে কোনও গভীর ষড়যন্ত্র নেই।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিরোধী শিবিরও কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। তাদের বক্তব্য, শাসক দলের ভিতরেই যদি এই ধরনের সমন্বয়হীনতা থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের সমস্যা নিয়ে তারা কতটা সংবেদনশীল, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই পোস্ট ঘিরে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে—কেউ মনোরঞ্জন ব্যাপারির পাশে দাঁড়াচ্ছেন, কেউ আবার এটাকে দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে গুরুত্ব কমিয়ে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, বলাগড়ের একতারপুরের সভা শুধু “ঐতিহাসিক” জনসমাগমের জন্যই নয়, বরং এলাকার বিধায়কের অনুপস্থিতি এবং তা নিয়ে প্রকাশ্যে ক্ষোভপ্রকাশের কারণে রাজনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছে। আগামী দিনে এই ঘটনার প্রভাব তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় সংগঠনে কীভাবে পড়ে এবং দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা রাজ্য নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনও বার্তা দেন কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের।
