গতকাল শুক্রবার রাতে লখনউয়ের অটল বিহারী বাজপেয়ী একানা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে আইপিএল ২০২৫-এর একটি উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে মুম্বই ইন্ডিয়ান্স (এমআই) লখনউ সুপার জায়ান্টসের (এলএসজি) কাছে ১২ রানে পরাজিত হয়েছে। ২০৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে মুম্বই শেষ পর্যন্ত ২০ ওভারে ১৯১/৫-এ থেমে যায়। এই ম্যাচে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তিলক বর্মাকে (Tilak Varma) রিটায়ার্ড আউট করার সিদ্ধান্ত। বিশেষজ্ঞ ব্যাটার তিলকের জায়গায় মিচেল স্যান্টনারের মতো একজন প্রধানত বোলারকে কেন মাঠে নামানো হল, তা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
ভারতীয় ক্রিকেটার হনুমা বিহারী এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ লিখেছেন, “তিলক বর্মা স্যান্টনারের জন্য রিটায়ার্ড আউট??? আমাকে বোঝান! হার্দিক গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, কিন্তু তিনি রিটায়ার্ড আউট হননি! তাহলে তিলক কেন?” এই পোস্টটি ক্রিকেটপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কী ঘটেছিল ম্যাচে?
মুম্বই ইন্ডিয়ান্স ২০৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুটা ভালোই করেছিল। সূর্যকুমার যাদব ৪৩ বলে ৬৭ রানের একটি দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। নমন ধীরও ২৪ বলে ৪৬ রান করে দলকে মজবুত অবস্থানে রাখেন। কিন্তু ম্যাচের শেষ দিকে এসে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৯তম ওভারে, যখন ৭ বলে ২৪ রান প্রয়োজন এবং ৬ উইকেট হাতে ছিল, তখন তিলক বর্মাকে রিটায়ার্ড আউট করা হয়। তিলক তখন ২৩ বলে ২৫ রান করে ফেলেছিলেন, যার মধ্যে ছিল মাত্র দুটি চার। তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১০৮.৭০, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্য ধীর গতির বলে বিবেচিত হয়।
তিলকের জায়গায় মিচেল স্যান্টনারকে মাঠে নামানো হয়, যিনি একজন অলরাউন্ডার হলেও মূলত বোলার হিসেবে পরিচিত। স্যান্টনার মাত্র একটি বল খেলার সুযোগ পান এবং ২ রান নেন। শেষ ওভারে হার্দিক পান্ডিয়া প্রথম বলে ছক্কা হাঁকালেও, আবেশ খানের নিখুঁত ইয়র্কারের সামনে মুম্বই হার মানতে বাধ্য হয়। ফলে এই সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিযুক্ত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
হার্দিক ও কোচের ব্যাখ্যা
ম্যাচ শেষে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া এই সিদ্ধান্তকে ‘স্পষ্ট’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের কিছু বড় শট দরকার ছিল। তিলক সেটা খেলতে পারছিল না। ক্রিকেটে এমন কিছু দিন আসে যখন আপনি চেষ্টা করেন, কিন্তু সফল হন না। এটা একটা কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল।” অন্যদিকে, মুম্বইয়ের প্রধান কোচ মাহেলা জয়বর্ধনে সাংবাদিকদের বলেন, “তিলক চেষ্টা করছিল, কিন্তু রানে ফিরতে পারছিল না। আমরা শেষ কয়েক ওভার পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম, আশা করেছিলাম যে সে সময় পেয়ে বড় শট খেলবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে একজন নতুন ব্যাটার দরকার। এটা করা সুন্দর নয়, কিন্তু কৌশলগতভাবে এটা করতে হয়েছে।”
সমালোচনার ঝড়
হনুমা বিহারী ছাড়াও অনেক প্রাক্তন ক্রিকেটার এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। হরভজন সিং বলেছেন, “তিলককে স্যান্টনারের জন্য রিটায়ার্ড করা ভুল ছিল। স্যান্টনার কি তিলকের চেয়ে ভালো হিটার? যদি পোলার্ড বা অন্য কোনো বড় হিটার আসত, তাহলে বোঝা যেত।” সুনীল গাওস্করও বলেছেন, “তিলক ভারতের হয়ে তিন নম্বরে ভালো ব্যাট করেছে। তাকে এভাবে নিচের দিকে পাঠানো এবং তারপর রিটায়ার্ড করা বোধগম্য নয়।” ইরফান পাঠান এক্স-এ লিখেছেন, “তিলক রিটায়ার্ড আউট আর স্যান্টনার এলেন? আমার কাছে মানে হয় না।”
বিহারী উল্লেখ করেছেন যে, গত মাসে গুজরাট টাইটান্সের বিরুদ্ধে হার্দিক নিজেও সংগ্রাম করেছিলেন, কিন্তু তাকে রিটায়ার্ড আউট করা হয়নি। এই দ্বিমুখী নীতি নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন। তিলককে মেগা নিলামের আগে ধরে রাখা হয়েছিল, তবে এই সিদ্ধান্ত কি তার প্রতি আস্থার অভাব প্রকাশ করে?
মুম্বইয়ের প্রচারণা এবং চোটের সমস্যা
আইপিএল ২০২৫-এ মুম্বই ইন্ডিয়ান্স শুরুতে চেন্নাই সুপার কিংস এবং গুজরাট টাইটান্সের কাছে পরাজিত হয়। এরপর তারা ঘরের মাঠে কলকাতা নাইট রাইডার্সকে হারিয়ে প্রত্যাবর্তন করে। কিন্তু এলএসজি-র বিরুদ্ধে এই হার তাদের তৃতীয় পরাজয়। আগামী ম্যাচে তারা ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর মুখোমুখি হবে, যেখানে তারা এই মরশুমে একমাত্র জয় পেয়েছে।
এদিকে, মুম্বইয়ের জন্য আরেকটি চিন্তার বিষয় হল প্রাক্তন অধিনায়ক রোহিত শর্মার চোট। এলএসজি ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপের সময় হাঁটুতে চোট পাওয়ায় তিনি খেলতে পারেননি। তার ফিটনেস নিয়ে এখনও কোনো আপডেট দেওয়া হয়নি।
কলকাতার দৃষ্টিকোণ
কলকাতার ক্রিকেটপ্রেমীরা এই ঘটনাকে কেকেআর-এর সঙ্গে তুলনা করছেন। কেকেআর-এর বিরুদ্ধে মুম্বইয়ের জয়ে হার্দিকের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স প্রশংসিত হয়েছিল। কিন্তু এলএসজি-র বিরুদ্ধে তার ৫ উইকেট (৫/৩৬) এবং ২৮ রানের (১৬ বলে) প্রচেষ্টা বৃথা যায়। স্থানীয় ভক্তরা বলছেন, “হার্দিকের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে তিলকের মতো তরুণ খেলোয়াড়ের আত্মবিশ্বাসে আঘাত লাগতে পারে।”
ভবিষ্যৎ কী?
এই সিদ্ধান্ত মুম্বইয়ের কৌশলের উপর নতুন আলোকপাত করেছে। তিলককে রিটায়ার্ড আউট করা কি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নতুন ট্রেন্ড হয়ে উঠবে, নাকি এটি একটি ব্যর্থ পরীক্ষা হিসেবে থেকে যাবে? হার্দিকের নেতৃত্ব বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। তিনি নিজে বলেছেন, “এটি একটি দীর্ঘ টুর্নামেন্ট। কয়েকটি জয় পেলে ছন্দে ফিরব।” কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত দলের মনোবলের উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
৫ এপ্রিল ২০২৫-এ, আইপিএলের এই বিতর্ক ক্রিকেট বিশ্বে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। তিলক বর্মার রিটায়ার্ড আউট প্রমাণ করে যে, ক্রিকেটে কৌশল এবং আবেগ একসঙ্গে চলে। মুম্বই কি এই হার থেকে শিক্ষা নিয়ে ফিরবে? আগামী দিনে ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামই তার উত্তর দেবে। ততক্ষণ, ক্রিকেটপ্রেমীরা এই প্রশ্নের জবাব খুঁজছেন—‘হার্দিক নিজে কেন নয়, তিলক কেন?’