আট বছর পর জেআরডি টাটা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে প্রথমবার আইএসএল সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে দর্শকাসন পূর্ণ হয়েছিল। কিন্তু এই উচ্ছ্বাসের মাঝেই ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। জামশেদপুর এফসি (Jamshedpur FC) সম্প্রতি অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশন (এআইএফএফ) এবং ফুটবল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (এফএসডিএল)-এর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ৩ এপ্রিল, ২০২৫-এ জামশেদপুরের ‘দ্য ফার্নেস’-এ অনুষ্ঠিত আইএসএল সেমিফাইনালের প্রথম লেগে মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট (Mohun Bagan)-এর ভ্রমণরত সমর্থকদের অশোভন এবং আক্রমণাত্মক আচরণের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
জামশেদপুর এফসি-র তরফে দাবি করা হয়েছে যে, তারা এই অভিযোগের সমর্থনে একাধিক প্রমাণ জমা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিসিটিভি ফুটেজ, স্টেডিয়ামের বিভিন্ন কোণ থেকে তোলা ছবি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। স্টেডিয়ামের কর্মী এবং নিরাপত্তা কর্মীদের সাক্ষ্যও এই অভিযোগের পক্ষে জোরালো ভিত্তি তৈরি করেছে। জানা গেছে, ম্যাচ শেষে মোহনবাগানের কিছু সমর্থক পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন, যার ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
আইএসএল সেমিফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস এবং আবেগ থাকা স্বাভাবিক। এই ধরনের ম্যাচে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়। এই পরিস্থিতি এড়াতে জামশেদপুর এফসি তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি নির্দেশিকা জারি করেছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, “ম্যাচের দিনে সুষ্ঠু অভিজ্ঞতা নিশ্চিত করতে, মোহনবাগান এসজি-এর ভ্রমণরত সমর্থকদের শুধুমাত্র নির্ধারিত অ্যাওয়ে স্ট্যান্ড (সাউথ ওয়েস্ট আপার) থেকে টিকিট কেনার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।” এই ব্যবস্থার লক্ষ্য ছিল সমর্থকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ম্যাচের পরিবেশ সুষ্ঠুভাবে রাখা। কিন্তু পরিকল্পনা সত্ত্বেও, ম্যাচের পরে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
মোহনবাগান সমর্থকদের একাংশের অশোভন আচরণ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত কিছু ভিডিওতে দেখা গেছে, কয়েকজন সমর্থক আহত হয়েছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। এই ঘটনার পর মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট তাদের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিবৃতি জারি করে। বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট হিসেবে জেআরডি টাটা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের অ্যাওয়ে স্ট্যান্ডে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা কর্মীদের অন্যায্য আচরণ এবং আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমাদের সবাইকে মনে রাখতে হবে, ফুটবল সমর্থক ছাড়া কিছুই নয়।”
মোহনবাগানের এই বিবৃতি এসেছে যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আহত সমর্থকদের ছবি এবং হাসপাতালে ভর্তির খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ক্লাবটি তাদের ভ্রমণরত সমর্থকদের উপর হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। তারা জানিয়েছে, এই ধরনের ঘটনা ফুটবলের চেতনার পরিপন্থী। সমর্থকদের একাংশের দাবি, পুলিশ এবং স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা কর্মীরা অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে, যার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, জামশেদপুর এফসি-র অভিযোগে বলা হয়েছে, মোহনবাগান সমর্থকদের অশোভন আচরণ এবং অশ্লীল মন্তব্যই এই সংঘর্ষের মূল কারণ।
মাঠের খেলায় জামশেদপুর এফসি ২-১ গোলে মোহনবাগান সুপার জায়ান্টকে হারিয়ে প্রথম লেগে সামান্য লিড পেয়েছে। জাভি সিভেরিও এবং জাভি হার্নান্দেজের গোলে জামশেদপুর জয় ছিনিয়ে নেয়, যদিও মোহনবাগানের জেসন কামিংস একটি গোল করে ম্যাচে সমতা ফেরানোর চেষ্টা করেছিলেন। এই জয়ের ফলে জামশেদপুর এফসি এখন ফাইনালে ওঠার দ্বারপ্রান্তে। আগামী ৭ এপ্রিল কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় লেগে মোহনবাগানের কাছে পরাজয় এড়াতে পারলে, জামশেদপুরের কোচ খালিদ জামিল আইএসএল-এর দশ বছরের ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় কোচ হিসেবে দলকে ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার গৌরব অর্জন করবেন।
মোহনবাগানের কোচ হোসে মোলিনা তাঁর দলকে কলকাতায় সমর্থকদের উৎসাহের মধ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রস্তুত করছেন। অন্যদিকে, খালিদ জামিলের দল এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায় না। দ্বিতীয় লেগে যদি জামশেদপুর গোলশূন্য ড্র করতে পারে বা ম্যাচ জিততে পারে, তবে তারা ইতিহাস গড়বে।
এই ঘটনা ফুটবল সমর্থকদের আচরণ এবং স্টেডিয়ামে নিরাপত্তার বিষয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। জামশেদপুর এফসি-র অভিযোগে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, কিছু সমর্থক স্টেডিয়ামের সম্পত্তি নষ্ট করেছে এবং অশ্লীল মন্তব্য করেছে। এই ঘটনার তদন্তের জন্য এআইএফএফ এবং এফএসডিএল-এর উপর চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে, মোহনবাগান সমর্থকদের দাবি, তাদের উপর অযাচিত আক্রমণ হয়েছে।
স্থানীয় একজন সমর্থক বলেন, “ফুটবল মানে আবেগ, কিন্তু এটা সংঘর্ষের কারণ হওয়া উচিত নয়। দুই পক্ষেরই শান্তি বজায় রাখা দরকার।” এই ঘটনার পর ভারতীয় ফুটবলে সমর্থকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার দাবি উঠেছে।
জামশেদপুর এফসি এবং মোহনবাগানের মধ্যে এই সেমিফাইনাল শুধু মাঠের খেলার জন্যই নয়, মাঠের বাইরের ঘটনার জন্যও আলোচনায় থাকবে। খালিদ জামিলের দল যখন ইতিহাস গড়ার দ্বারপ্রান্তে, তখন এই অভিযোগ এবং প্রতিক্রিয়া আইএসএল-এর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কলকাতায় দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে কী হবে, তা দেখার জন্য সমর্থকরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ফুটবলের আসল জয় সমর্থকদের ভালোবাসা এবং শৃঙ্খলার মধ্যেই নিহিত।