ক্রিকেটের জন্য ভালো চাকরি ছেড়েছিলেন আশ্বিনী কুমার

আইপিএল ২০২৫-এ (IPL 2025) মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের (এমআই) তরুণ বোলার অশ্বনী কুমার (Ashwani Kumar ) তার অভিষেক ম্যাচে চার উইকেট নিয়ে সকলের নজর কেড়েছেন। ৩১ মার্চ…

Ashwani Kumar

আইপিএল ২০২৫-এ (IPL 2025) মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের (এমআই) তরুণ বোলার অশ্বনী কুমার (Ashwani Kumar ) তার অভিষেক ম্যাচে চার উইকেট নিয়ে সকলের নজর কেড়েছেন। ৩১ মার্চ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে কলকাতা নাইট রাইডার্সের (কেকেআর) বিরুদ্ধে এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি আইপিএল ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় বোলার হিসেবে অভিষেকে চার উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন। তবে, তার এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে একটি অসাধারণ গল্প—ক্রিকেটের প্রতি অটল ভালোবাসা, আত্মত্যাগ এবং অধ্যবসায়ের গল্প।

   

স্থিতিশীল চাকরি ছেড়ে ক্রিকেটের পথে Ashwani Kumar

অশ্বনী কুমারের জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে। পাঞ্জাবের প্রাক্তন ক্রিকেটার মন্দীপ সিং, যিনি অশ্বনীর সঙ্গে শের-ই-পাঞ্জাব টি-টোয়েন্টি লিগে খেলেছেন, ইংরেজি দৈনিক টাইমস অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, ২০২৪ সালে অশ্বনীকে মোহালিতে একটি স্থিতিশীল চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই চাকরি তার পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারত। কিন্তু, চাকরির শর্ত ছিল তাকে পাঞ্জাব ছেড়ে অন্যত্র যেতে হবে, যা তার ক্রিকেটের প্রতিশ্রুতি এবং অনুশীলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।

Advertisements

Also Read | ২৭ কোটি খরচ করেও ঋষভ পন্থের ফ্লপ শো এলএসজিতে!

মন্দীপ সিং বলেন, “অশ্বনী একটি অত্যন্ত সাধারণ পরিবার থেকে এসেছে। তার বাবা-মা তাকে সবসময় সমর্থন করেছেন, কিন্তু আর্থিক সংকটের মধ্যেও তাকে মোহালিতে নিয়মিত অনুশীলনের জন্য যেতে হতো। ২০২৪ সালে তাকে যখন চাকরির প্রস্তাব দেওয়া হয়, তখন সে আমাকে বলেছিল, ‘আমি পাঞ্জাবের হয়ে খেলার জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চাই। আমি হাল ছাড়তে চাই না।’ এই কথাগুলো তার ক্রিকেটের প্রতি অটল নিষ্ঠা এবং আবেগের প্রমাণ।”

ইনজুরির কারণে হারিয়েছিলেন সুযোগ

অশ্বনী কুমারের ক্রিকেট যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। মন্দীপ সিং আরও জানান, অশ্বনী ২০১৯ সালে পাঞ্জাবের হয়ে প্রথমবার ডাক পান। কিন্তু তারপর থেকে তিনি একাধিক ইনজুরির শিকার হন, যার ফলে তিনি প্রায় তিন থেকে চার বছর ক্রিকেট থেকে দূরে থাকতে বাধ্য হন। পাঞ্জাব ক্রিকেট দলে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণেও তার খেলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

Also Read | অরেঞ্জ ক্যাপ নিকোলাস পুরানের, পার্পল ক্যাপ নূর আহমদের দখলে

“ইনজুরির কারণে অশ্বনী অনেক সুযোগ হারিয়েছে। পাঞ্জাব দলে সুযোগ পাওয়া খুবই কঠিন, কারণ সেখানে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। কিন্তু এই সব বাধা সত্ত্বেও অশ্বনী কখনো হাল ছাড়েনি। সে নিয়মিত অনুশীলন করেছে এবং নিজেকে প্রমাণ করার জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছে,” বলেন মন্দীপ, যিনি ২০১০ সালে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলে খেলেছিলেন।

আইপিএল ২০২৫-এ স্বপ্নের অভিষেক

অশ্বনী কুমারের কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা ফল দিয়েছে আইপিএল ২০২৫-এ। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাকে ৩০ লাখ টাকায় দলে ভিড়িয়েছিল, এবং তারা তাদের সিদ্ধান্তে ভুল করেনি। ৩১ মার্চ কেকেআরের বিরুদ্ধে তার অভিষেক ম্যাচে বাঁহাতি এই পেসার ৩ ওভারে মাত্র ২৪ রান দিয়ে ৪ উইকেট তুলে নেন। এই পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি আইপিএল ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় বোলার হিসেবে অভিষেকে চার উইকেট নেওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

অশ্বনী তার প্রথম বলেই কেকেআর অধিনায়ক অজিঙ্কা রাহানেকে আউট করেন। এরপর তিনি রিঙ্কু সিং, মনীষ পাণ্ডে এবং আন্দ্রে রাসেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের উইকেট তুলে নিয়ে কেকেআরের ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে দেন। তার বোলিংয়ের সৌজন্যে কেকেআর মাত্র ১১৬ রানে অলআউট হয়। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, হার্দিক পান্ডিয়ার নেতৃত্বে, এই রান ৮ উইকেটে তাড়া করে ম্যাচটি সহজেই জিতে নেয়। অশ্বনী তার এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের জন্য ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান।

অশ্বনীর পটভূমি ও সংগ্রাম

অশ্বনী কুমার চণ্ডীগড়ের কাছে ঝাঞ্জেরি নামে একটি ছোট্ট গ্রামের বাসিন্দা। তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুবই সাধারণ। ক্রিকেট একটি ব্যয়বহুল খেলা, এবং অশ্বনীকে প্রায়ই সাধারণ জিনিসপত্র যেমন ভালো জুতো কেনার জন্যও সংগ্রাম করতে হয়েছে। তবুও, তিনি কখনো হতাশ হননি। তিনি নিয়মিত মোহালিতে অবস্থিত লঞ্চিং প্যাড ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে অনুশীলনের জন্য যাতায়াত করতেন। তার কোচ বরিন্দর সিং বলেন, “অশ্বনী অত্যন্ত পরিপক্কভাবে তার সংগ্রাম মোকাবিলা করেছে। তার মধ্যে একটি অদম্য ইচ্ছাশক্তি রয়েছে।”

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের স্কাউটিংয়ের সাফল্য

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স সবসময়ই তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার জন্য বিখ্যাত। অশ্বনীকে তারা শের-ই-পাঞ্জাব টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টে খেলার সময় লক্ষ্য করেছিল। সেখানে তিনি বিএলভি ব্লাস্টার্সের হয়ে খেলে ৪/৩৬-এর সেরা বোলিং ফিগার অর্জন করেছিলেন। তার ডেথ ওভারে বোলিংয়ের দক্ষতা, পেস ভেরিয়েশন এবং ওয়াইড ইয়র্কারের নিয়ন্ত্রণ মুম্বাইয়ের স্কাউটদের মুগ্ধ করেছিল। এমআই-এর প্রধান কোচ মাহেলা জয়াবর্ধনে নিজে অশ্বনীকে ট্রায়ালে দেখে তাকে দলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ম্যাচের পর এমআই অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া বলেন, “আমাদের স্কাউটরা দারুণ কাজ করেছে। অশ্বনীর মধ্যে আমরা একটি আলাদা গুণ দেখেছি। তার বোলিং অ্যাকশন, গতি এবং লেট সুইং আমাদের মুগ্ধ করেছে। আজ সে আমাদের প্রত্যাশার চেয়েও ভালো করেছে।”

অশ্বনীর স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ

অশ্বনী নিজে ম্যাচের পর বলেন, “আমি খুব ভালো লাগছে। ম্যাচের আগে আমি খুব নার্ভাস ছিলাম। দুপুরে আমি কিছুই খাইনি, শুধু একটা কলা খেয়েছিলাম। কিন্তু দলের পরিবেশ আমাকে সাহস জুগিয়েছে। হার্দিক ভাই আমাকে বলেছিলেন, ‘উপভোগ করো, তোমার দক্ষতার উপর ভরসা রাখো।’ আমার গ্রামের সবাই আমাকে খেলতে দেখেছে, তারা আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। আমি খুব খুশি।”

অশ্বনীর এই সাফল্য তার গ্রামের মানুষের জন্যও গর্বের বিষয়। তার সতীর্থ রামদীপ সিং বলেন, “আমরা একই অ্যাকাডেমিতে অনুশীলন করি। আমি তার জন্য খুব খুশি। তবে আমি আজ তার বোলিংয়ের মুখোমুখি হতে পারিনি, যা আমার একটি ইচ্ছা ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে এই সুযোগ পাব।”

অশ্বনী কুমারের গল্প আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে। একটি সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে, ইনজুরি এবং আর্থিক সংকটের মধ্যেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। স্থিতিশীল চাকরির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তিনি ক্রিকেটের প্রতি তার ভালোবাসা এবং নিষ্ঠা বেছে নিয়েছেন। আইপিএল ২০২৫-এ তার এই স্বপ্নের অভিষেক প্রমাণ করে যে কঠোর পরিশ্রম এবং অধ্যবসায় কখনো বৃথা যায় না। এখন দেখার বিষয়, এই তরুণ পেসার কীভাবে তার ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আরও কত বড় সাফল্য অর্জন করেন।