ভারতীয় ফুটবলের দ্বিতীয় স্তরের প্রতিযোগিতা আই-লিগ ২০২৪-২৫ এখন তার শেষ মুহূর্তে পৌঁছে গেছে। এই উত্তেজনাপূর্ণ সময়ে নতুন একটি বিতর্ক সামনে এসেছে। পাঞ্জাবের দল নামধারী এফসি-র বিরুদ্ধে অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানোর অভিযোগ তুলেছে এসসি বেঙ্গালুরু। এই ঘটনা লিগের পয়েন্ট তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। ম্যাচ নম্বর ১২২-এ লুধিয়ানায় নামধারী এফসি (Namdhari FC) এসসি বেঙ্গালুরুকে (SC Bengaluru) ২-১ গোলে হারিয়েছিল। এই জয়ের ফলে নামধারী পয়েন্ট তালিকায় উঠে এসেছিল। কিন্তু এখন এই ম্যাচ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা লিগের শিরোপা দৌড়ে না হলেও পয়েন্ট তালিকার নিচের দিকে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
বেঙ্গালুরুর (SC Bengaluru) অভিযোগ কী?
এসসি বেঙ্গালুরু আই-লিগের নিয়ম ও বিধি অনুযায়ী অফিসিয়াল অভিযোগ দায়ের করেছে। তাদের দাবি, নামধারী এফসি-র খেলোয়াড় ক্লেডসন ডি সিলভা (দে) এই ম্যাচে খেলার জন্য যোগ্য ছিলেন না। আই-লিগ ২০২৪-২৫-এর নিয়মের ১২.৩.২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় বিভিন্ন ম্যাচে চারটি হলুদ কার্ড পেলে তাকে পরবর্তী ম্যাচে নিষিদ্ধ থাকতে হয়। এরপর সাতটি হলুদ কার্ড পর্যন্ত আরও একটি ম্যাচের জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
Also Read |ডায়মন্ড হারবারকে রুখে আরএফডিএল সেমিফাইনালে জামশেদপুর এফসি
বেঙ্গালুরুর অভিযোগ, ক্লেডসন ডি গোকুলাম কেরালার বিরুদ্ধে ম্যাচ পর্যন্ত সাতটি হলুদ কার্ড পেয়েছিলেন। এছাড়া, ওই ম্যাচে তিনি একটি সরাসরি লাল কার্ডও পান। একটি লাল কার্ডের জন্য এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এবং সাতটি হলুদ কার্ডের জন্য আরও একটি ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা মিলিয়ে তাঁকে কমপক্ষে দুটি ম্যাচে খেলা থেকে বিরত থাকার কথা ছিল। কিন্তু নামধারী তাঁকে এসসি বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়েছে, যা নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে বেঙ্গালুরু। এই অভিযোগে তারা এটিকে ভারতীয় ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগে নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগে গুরুতর ত্রুটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এর ফলাফল কী হতে পারে?
এই অভিযোগের ভিত্তিতে অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (এআইএফএফ) ডিসিপ্লিনারি কমিটি যদি রায় দেয়, তবে নামধারী এফসি-র তিন পয়েন্ট কাটা যেতে পারে এবং তাদের গোল পার্থক্যে -৩ যোগ হতে পারে। এই রায় পয়েন্ট তালিকায় বড় পরিবর্তন আনবে। যদিও এটি শিরোপা দৌড়ে সরাসরি প্রভাব ফেলবে না, তবুও নামধারী এফসি তালিকায় নবম স্থানে নেমে যেতে পারে, ডেম্পো এসসি-র পিছনে। অন্যদিকে, এসসি বেঙ্গালুরু তিন পয়েন্ট পেলে আইজল এফসি-কে ছাড়িয়ে দশম স্থানে উঠে আসতে পারে।
বর্তমানে এসসি বেঙ্গালুরু রেলিগেশন জোনে রয়েছে, ২০ পয়েন্ট নিয়ে। নামধারী এফসি ২১ ম্যাচে ৩২ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ স্থানে আছে। এই রায় যদি বেঙ্গালুরুর পক্ষে যায়, তবে তারা রেলিগেশন থেকে বাঁচার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলতে পারে।
ম্যাচের ঘটনা
ম্যাচ নম্বর ১২২ গত ৩০ মার্চ লুধিয়ানার নামধারী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। নামধারী এফসি ২-১ গোলে জয়ী হয়। প্রথমার্ধে আকাশদীপ সিং ২৮ মিনিটে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। দ্বিতীয়ার্ধে ফ্রান্সিস অ্যাডো ৮৫ মিনিটে আরেকটি গোল করে ব্যবধান বাড়ান। শেষ মুহূর্তে এসসি বেঙ্গালুরুর ক্লারেন্স ফার্নান্দেজ ৯০ মিনিটে একটি গোল ফিরিয়ে দেন, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। এই জয় নামধারীকে পয়েন্ট তালিকায় উঠতে সাহায্য করেছিল, কিন্তু এখন এই বিতর্ক তাদের অবস্থানে প্রশ্ন তুলেছে।
পূর্বের বিতর্ক
এটি নামধারী এফসি-র প্রথম বিতর্ক নয়। এর আগে জানুয়ারি মাসে ইন্টার কাশি-র বিরুদ্ধে ম্যাচে তারা অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানোর জন্য তিন পয়েন্ট হারিয়েছিল। সেই ম্যাচে তারা ২-০ গোলে জিতলেও, এআইএফএফ ডিসিপ্লিনারি কমিটি তিন পয়েন্ট কেটে ইন্টার কাশি-কে দেয়। যদিও পরে এআইএফএফ অ্যাপিল কমিটি সেই রায় স্থগিত করে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও অমীমাংসিত। এছাড়া, নামধারী ইন্টার কাশি-র বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বিদেশি খেলোয়াড় খেলানোর অভিযোগ তুলেছিল, যার শুনানি এখনও বাকি।
আই-লিগের শেষ পর্ব
আই-লিগ এখন তার শেষ ম্যাচ সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। চার্চিল ব্রাদার্স, গোকুলাম কেরালা এবং রিয়াল কাশ্মীর শিরোপার দৌড়ে রয়েছে। ইন্টার কাশিও নামধারী-র সঙ্গে পূর্বের বিতর্কের রায়ের ওপর নির্ভর করে শিরোপার দাবিদার হতে পারে। এই বিতর্কগুলো লিগের ফলাফলকে আরও জটিল করে তুলেছে। নিচের দিকে এসসি বেঙ্গালুরু এবং আইজল এফসি রেলিগেশনের হুমকিতে রয়েছে। এই অভিযোগের ফলাফল তাদের ভাগ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনায় সমর্থকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বেঙ্গালুরুর সমর্থকরা বলছেন, “নিয়ম ভাঙার শাস্তি পাওয়া উচিত। এটা আমাদের রেলিগেশন থেকে বাঁচার শেষ সুযোগ।” অন্যদিকে, নামধারীর সমর্থকরা দাবি করেছেন, “এটা আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আমরা মাঠে জিতেছি, এখন পয়েন্ট কাটা অন্যায়।” সামাজিক মাধ্যমে এই বিতর্ক নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছে।
এআইএফএফ-এর ভূমিকা
এআইএফএফ ডিসিপ্লিনারি কমিটির হাতে এখন এই মামলার ভাগ্য। পূর্বের বিতর্কে দেখা গেছে, তারা অযোগ্য খেলোয়াড় খেলানোর ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে, অ্যাপিল কমিটির হস্তক্ষেপে কিছু রায় স্থগিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে তারা কী সিদ্ধান্ত নেয়, তা লিগের অখণ্ডতা এবং ন্যায্যতার ওপর প্রভাব ফেলবে।
এই ধরনের বিতর্ক ভারতীয় ফুটবলের প্রশাসনিক দুর্বলতাকে তুলে ধরে। নিয়ম প্রয়োগে স্বচ্ছতা এবং ধারাবাহিকতার অভাব প্রায়ই সমালোচিত হয়। এই ঘটনা আই-লিগের প্রতিযোগিতামূলক চেতনাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। ভক্তরা চান, এআইএফএফ দ্রুত এবং ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত নিক, যাতে লিগের শেষ পর্বে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে।
Also Read | সুপার কাপে কেরালাকে চ্যাম্পিয়ন করতে কাতালার কৌশলগত পরিবর্তন!
আই-লিগ ২০২৪-২৫-এর এই বিতর্ক শুধু নামধারী এবং এসসি বেঙ্গালুরুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো লিগের পয়েন্ট তালিকা এবং প্রতিযোগিতার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে। এআইএফএফ-এর রায়ের অপেক্ষায় সমর্থকরা মুখিয়ে আছেন। এই ঘটনা ভারতীয় ফুটবলে নিয়মের কঠোর প্রয়োগ এবং স্বচ্ছতার গুরুত্ব আরও একবার সামনে এনেছে।