আইপিএল ২০২৫-এ দিল্লি ক্যাপিটালস (Delhi Capitals ) তাদের অপ্রতিরোধ্য ফর্ম অব্যাহত রেখে শনিবার চেন্নাই সুপার কিংস (সিএসকে)-কে ২৫ রানে পরাজিত করেছে। চেন্নাইয়ের এমএ চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে, যিনি ‘চেপাক’ নামে পরিচিত, এই ম্যাচে সিএসকে ব্যাটারদের আরেকটি হতাশাজনক পারফরম্যান্স দলটিকে তৃতীয় পরাজয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ১৮৪ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে স্বাগতিকরা মাত্র ১৫৮/৫-এ থামে, আর দিল্লি ১৫ বছর পর চেপাকে প্রথম জয়ের স্বাদ পায়।
কেএল রাহুলের দুর্দান্ত ৭৭ রানের ইনিংস এবং বোলারদের শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রচেষ্টার উপর ভর করে দিল্লি এই ম্যাচে পূর্ণ আধিপত্য দেখায়। প্রথমে ব্যাট করে দিল্লি একটি চ্যালেঞ্জিং পিচে ১৮৩ রানের শক্তিশালী স্কোর গড়ে। এরপর তাদের বোলাররা সিএসকে-কে ২০ ওভারে ১৫৮ রানে আটকে দিয়ে একটি বড় জয় নিশ্চিত করে।
দুপুরের ম্যাচে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নেয় দিল্লি। শুরুটা ভালো হয়নি—হার্ড-হিটিং ওপেনার জেক ফ্রেজার ম্যাকগার্ক শূন্য রানে আউট হন। সিএসকে-র পক্ষে খলিল আহমেদ প্রথম ওভারেই দিল্লির শিবিরে ধাক্কা দেন। কিন্তু এরপর কেএল রাহুল এবং তরুণ উইকেটকিপার-ব্যাটার অভিষেক পোরেল দলের হাল ধরেন। অভিজ্ঞ ফাফ ডু প্লেসিসের অনুপস্থিতিতে এই জুটি দ্বিতীয় উইকেটে ৫৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে দিল্লির ইনিংসকে ট্র্যাকে ফেরায়।
পোরেল ২০ বলে ৩৩ রানের একটি দারুণ ইনিংস খেলেন, যেখানে ছিল কয়েকটি দুর্দান্ত শট। তাঁর বিদায়ের পর রাহুল এক প্রান্ত আগলে রেখে সিএসকে-র স্পিনারদের উপর ঝড় তোলেন। মিডল ওভারে তিনি স্পিনারদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করেন এবং ফর্মে থাকা নূর আহমাদের বিরুদ্ধেও দাপট দেখান। নূর তিন ওভারে ৩৬ রান দিয়ে ফেলেন। রাহুল ৫১ বলে ৭৭ রানের ইনিংসে ছয়টি চার ও তিনটি ছক্কা মারেন। তাঁকে সমর্থন করেন সমীর রিজভি (১৫ বলে ২০) এবং ট্রিস্টান স্টাবস, যিনি ১২ বলে অপরাজিত ২৪ রান করেন। এই প্রচেষ্টায় দিল্লি ১৮৩ রানের লড়াকু স্কোরে পৌঁছে যায়। উল্লেখ্য, সিএসকে ২০১৯ সালের পর থেকে ১৮০-এর বেশি রানের লক্ষ্য তাড়া করে জিততে পারেনি।
চেন্নাই সুপার কিংসের ব্যাটাররা আবারও লক্ষ্য তাড়ায় ব্যর্থ হয়। এই মরশুমে এটি তাদের দ্বিতীয় হোম ম্যাচে হার। ব্যাটিংয়ে স্থিতিশীলতা আনতে দলটি ডেভন কনওয়েকে একাদশে ফিরিয়ে আনে, কিন্তু এই পরিবর্তন কাজে আসেনি। কিউই ওপেনার মাত্র ১৪ বলে ১৩ রান করে আউট হন। রাচিন রবীন্দ্রও বড় রান করতে পারেননি—মাত্র ৬ বলে ৩ রান করে মুকেশ কুমারের বলে ক্যাচ এবং বোল্ড হন।
সিএসকে অধিনায়ক রুতুরাজ গায়কোয়াড় তিন নম্বরে ব্যাট করতে নামেন, কিন্তু মিচেল স্টার্কের বলে ৫ রানে ক্যাচ আউট হন। শীর্ষ তিন ব্যাটারকে হারিয়ে সিএসকে ৪১/৩-এ বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। মিডল অর্ডারের উপর ভরসা ছিল, কিন্তু শিবম দুবে (১৮) এবং রবীন্দ্র জাদেজা (২) বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। এমএস ধোনি সাত নম্বরে ব্যাট করতে নামেন, কিন্তু বড় শট খেলতে ব্যর্থ হন। তিনি ২৬ বলে অপরাজিত ৩০ রান করেন।
বিজয় শঙ্কর সিএসকে-র হয়ে সেরা পারফরম্যান্স দেখান। তিনি ৫৪ বলে অপরাজিত ৬৯ রান করেন, কিন্তু বড় শটের অভাবে দলকে জয়ের কাছে পৌঁছে দিতে পারেননি। ধোনি ও শঙ্কর ষষ্ঠ উইকেটে ৮৪ রানের জুটি গড়েন, কিন্তু দিল্লির বোলারদের দাপটে তা জয়ের জন্য যথেষ্ট হয়নি।
দিল্লির বোলাররা এই ম্যাচে দারুণ শৃঙ্খলা দেখান। মুকেশ কুমার রাচিনকে ফিরিয়ে দিয়ে শুরুতে ধাক্কা দেন। মিচেল স্টার্ক গায়কোয়াড়কে আউট করে সিএসকে-র মেরুদণ্ড ভেঙে দেন। খলিল আহমেদ এবং অন্যান্য বোলাররা মিডল ওভারে চাপ ধরে রাখেন, যার ফলে সিএসকে-র ব্যাটাররা ছন্দে ফিরতে পারেনি। শেষ ওভারগুলিতে ধোনি ও শঙ্কর চেষ্টা করলেও, দিল্লির পরিকল্পিত বোলিং তাদের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ রাখে।
এই হারের ফলে সিএসকে-র মরশুম শুরু হয়েছে হতাশাজনকভাবে। প্রথম চার ম্যাচে মাত্র দুই পয়েন্ট নিয়ে তারা পয়েন্ট টেবিলে অষ্টম স্থানে রয়েছে। তিন ম্যাচে তিন জয়ে ছয় পয়েন্ট নিয়ে দিল্লি ক্যাপিটালস শীর্ষে অবস্থান করছে। এই জয় দিল্লির আত্মবিশ্বাস বাড়াবে, যখন সিএসকে-র জন্য এটি একটি বড় ধাক্কা।
কেএল রাহুল এই ম্যাচের নায়ক। তাঁর ৭৭ রানের ইনিংস দিল্লিকে লড়াকু স্কোরে পৌঁছে দেয়। পোরেলের সঙ্গে জুটি এবং পরে স্টাবসের সঙ্গে তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং দিল্লির জয়ের ভিত গড়ে। সিএসকে-র স্পিনারদের বিরুদ্ধে তাঁর দাপট ছিল দেখার মতো।
সিএসকে-র ব্যাটিং লাইনআপ এই মরশুমে বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। গায়কোয়াড়, দুবে, জাদেজার মতো তারকারা ছন্দে নেই। ধোনি শেষ দিকে এলেও বড় শটে ব্যর্থ। বিজয় শঙ্কর ছাড়া কেউই দিল্লির বোলারদের মোকাবিলা করতে পারেননি। দলটির জন্য এখন পরবর্তী ম্যাচগুলি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দিল্লি ক্যাপিটালস চেপাকে ১৫ বছর পর প্রথমবার হারিয়ে তাদের শক্তি দেখিয়েছে। কেএল রাহুলের ব্যাটিং এবং বোলারদের দক্ষতায় তারা টানা তৃতীয় জয় তুলে নিয়েছে। অন্যদিকে, সিএসকে-র জন্য এই হার তাদের দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। আইপিএল ২০২৫-এ দিল্লি এখন শীর্ষে, আর সিএসকে-কে ফিরতে হলে বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।