AIFF সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে অনিলকুমারের নিয়োগে স্থগিতাদেশ আদালতের

অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) নতুন সেক্রেটারি জেনারেল পদে অনিলকুমার প্রভাকরণের নিয়োগে বড় ধাক্কা লেগেছে। দিল্লি হাইকোর্ট এই নিয়োগের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ…

Anilkumar Prabhakaran

অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের (AIFF) নতুন সেক্রেটারি জেনারেল পদে অনিলকুমার প্রভাকরণের নিয়োগে বড় ধাক্কা লেগেছে। দিল্লি হাইকোর্ট এই নিয়োগের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি পদক্ষেপে ভারতীয় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের (এমওয়াইএএস) নির্দেশিকা মেনে চলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। আদালতের এই সিদ্ধান্ত এআইএফএফ-এর নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জারি করা একটি পুরনো সার্কুলারের নির্দেশ লঙ্ঘনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এসেছে।

   

দিল্লি ফুটবল ক্লাবের ডিরেক্টর রঞ্জিত বাজাজ এই নিয়োগের বিরুদ্ধে একটি আবেদন দায়ের করেছিলেন। বিচারপতি সচিন দত্তের সামনে এই মামলার শুনানি হয়। আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে অনিলকুমার প্রভাকরণের নিয়োগ ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে মন্ত্রণালয়ের জারি করা একটি সার্কুলারের নিয়ম ভঙ্গ করেছে। এই সার্কুলারে জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর (এনএসএফ) মধ্যে সুশাসনের নীতি জোর দেওয়া হয়েছে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যিনি একবার কোনো এনএসএফ-এ নির্বাচিত পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁকে সেই ফেডারেশনের প্রশাসনিক পদে, যেমন চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার (সিইও) বা সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না।

Advertisements

সরকারের প্রশ্ন ও আইনি যুক্তি

রঞ্জিত বাজাজের পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট রাহুল মেহরা আদালতে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি জানান, অনিলকুমার প্রভাকরণ এআইএফএফ-এর এক্সিকিউটিভ কমিটির নির্বাচিত সদস্য ছিলেন। এরপর তিনি সেই পদ থেকে পদত্যাগ করে বেতনভিত্তিক সেক্রেটারি জেনারেল পদে নিযুক্ত হন। মেহরার দাবি, এই পদক্ষেপ মন্ত্রণালয়ের ২০২২ সালের সার্কুলারের চেতনা ও অক্ষর উভয়েরই লঙ্ঘন। এই নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি নির্বাচিত পদ থেকে একই ফেডারেশনে বেতনভিত্তিক প্রশাসনিক পদে যেতে পারবেন না। এই নিয়মের উদ্দেশ্য হল স্বার্থের সংঘাত এড়ানো এবং ফেডারেশনের শাসনের স্বচ্ছতা ও সততা নিশ্চিত করা।

ভারত সরকারের পক্ষ থেকেও এই নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সরকারের আইনজীবী জানিয়েছেন, বর্তমান নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রভাকরণের নিয়োগ অগ্রহণযোগ্য। এই অবস্থান মন্ত্রণালয়ের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।

AIFF-এর যুক্তি খারিজ

এআইএফএফ-এর পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট জয়ন্ত মেহতা নেতৃত্বাধীন আইনি দল যুক্তি দিয়েছিল যে, এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র সেই ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা মেয়াদ সংক্রান্ত নিয়ম এড়াতে চান। তবে, বিচারপতি সচিন দত্ত এই যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেছেন। তিনি এআইএফএফ-এর বক্তব্যকে অপ্রতুল বলে মনে করেছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রভাকরণের নিয়োগ স্পষ্টভাবে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশিকার লঙ্ঘন। এরপর আদালত আগামী ৮ এপ্রিল, ২০২৫ পর্যন্ত এই নিয়োগের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে।

ক্রীড়া শাসনে স্বচ্ছতার দাবি

এই সিদ্ধান্ত ভারতীয় ফুটবলে ক্রীড়া শাসনের ওপর ক্রমবর্ধমান তদারকির ইঙ্গিত দেয়। এটি ফুটবল ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং স্বার্থের সংঘাতমুক্ত পরিচালনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা ভারতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর প্রশাসনিক কাঠামোতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। অনেকে বলছেন, এই ধরনের বিতর্ক ক্রীড়ার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণের আস্থা কমায়।
৮ এপ্রিল নির্ধারিত চূড়ান্ত শুনানি এআইএফএফ-এর ভবিষ্যৎ শাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এই রায় ফেডারেশনের প্রশাসনিক কাঠামোকে আধুনিকীকরণ এবং ন্যায্য ও কার্যকর নেতৃত্বের নীতি মেনে চলার প্রচেষ্টার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

ঘটনার পটভূমি

অনিলকুমার প্রভাকরণকে গত বছর জুলাই মাসে এআইএফএফ-এর সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি কেরালার বাসিন্দা এবং এর আগে এআইএফএফ-এর এক্সিকিউটিভ কমিটির নির্বাচিত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। রঞ্জিত বাজাজের আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, প্রভাকরণ স্কোরলাইন স্পোর্টস নামে একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত, যা গত বছর সুপার লিগ কেরালার আয়োজন করেছিল। এই সংযোগের কারণে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আবেদনে আরও বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় টেবিল টেনিস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার একটি অনুরূপ ক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু এআইএফএফ-এর ক্ষেত্রে একই ধরনের পদক্ষেপ না নেওয়ায় অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে।

AIFF-এর প্রতিক্রিয়া

দিল্লি হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের পর এআইএফএফ তাদের পরবর্তী এক্সিকিউটিভ কমিটির বৈঠক স্থগিত করেছে, যা ৭ এপ্রিল নির্ধারিত ছিল। ফেডারেশনের সংবিধান অনুযায়ী, সেক্রেটারি জেনারেল অনুপস্থিত থাকলে ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজের জন্য স্বাক্ষরকারী কর্তৃপক্ষ হবেন। বর্তমানে এম সত্যনারায়ণ ডেপুটি সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তবে, তাঁকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

ফুটবলপ্রেমীদের প্রতিক্রিয়া

ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে এই ঘটনা নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এই ধরনের আইনি বিতর্ক ফুটবলের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে। একজন ফুটবল সমর্থক বলেন, “আমরা মাঠে খেলা দেখতে চাই, আদালতে নয়। এই বিতর্কগুলো শুধু সময় নষ্ট করে।” অন্যদিকে, কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, ক্রীড়া শাসনে স্বচ্ছতা এবং নিয়ম মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

বাংলার প্রেক্ষাপট

বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের জন্যও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার ক্লাবগুলো, যেমন ইস্টবেঙ্গল এবং মোহনবাগান, এআইএফএফ-এর অধীনে কাজ করে। ফেডারেশনের শাসন ব্যবস্থায় কোনো অসঙ্গতি বা বিতর্ক সরাসরি এই ক্লাবগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলার ফুটবল সমর্থকরা আশা করছেন যে, এই বিতর্কের দ্রুত সমাধান হবে এবং ভারতীয় ফুটবল তার উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে।

দিল্লি হাইকোর্টের এই স্থগিতাদেশ এআইএফএফ-এর প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতাকে সামনে এনেছে। অনিলকুমার প্রভাকরণের নিয়োগে স্থগিতাদেশ ভারতীয় ফুটবলের শাসনে স্বচ্ছতা ও ন্যায় নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেছে। আগামী ৮ এপ্রিলের শুনানি এই মামলার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করবে। তবে, এই ঘটনা ভারতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর জন্য একটি শিক্ষা হতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে নিয়ম মেনে এবং স্বার্থের সংঘাত এড়িয়ে কাজ করা যায়। ফুটবলপ্রেমীরা এখন অপেক্ষায় রয়েছেন, এই বিতর্ক কীভাবে সমাধান হয় এবং ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যায়।