আফগানিস্তান পুরুষ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হাশমতুল্লাহ শাহিদি (Hashmatullah Shahidi) তার দেশের মহিলা ক্রিকেটারদের খেলার অধিকারের পক্ষে সরব হয়েছেন। তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, তালিবান শাসনের অধীনে থাকা আফগানিস্তানে এই বিষয়টি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ২০২১ সালে তালিবান ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে দেশটিতে মহিলাদের উপর কঠোর আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। এই পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের মহিলা ক্রিকেটাররা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন, কারণ তালিবান নারীদের খেলাধুলা ও শিক্ষার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত ৩০ জানুয়ারি ২০২৫-এ, দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া অনেক আফগান মহিলা ক্রিকেটার অস্ট্রেলিয়ায় একটি দাতব্য ম্যাচে অংশ নিয়েছিলেন। এটি ছিল তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, যেখানে তারা প্রথমবারের মতো একসঙ্গে ক্রিকেট মাঠে নেমেছিলেন। ২০২০ সালে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (এসিবি) সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া ২৫ জন মহিলা ক্রিকেটারের মধ্যে ২২ জন এখন মেলবোর্ন বা ক্যানবেরায় বসবাস করছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই শাহিদি তার দেশের মহিলা ক্রিকেটারদের খেলার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
“হ্যাঁ, সবাই চায় সবাই যেন খেলতে পারে,” শাহিদি লাহোরে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময় বলেন, যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে নির্বাসিত আফগান মহিলা দলের খেলার সুযোগ পাওয়া উচিত কিনা। “আমি আগেও বলেছি, রাজনীতি এবং যে বিষয়গুলো আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না—আমরা শুধু ক্রিকেটার, আমরা মাঠের মধ্যে যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি তাই করি। আমরা মাঠেরই লোক এবং খেলার সময় আমরা সবসময় আমাদের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করি,” তিনি যোগ করেন।
ইংল্যান্ড বনাম আফগানিস্তান ম্যাচের আগে বয়কটের দাবি
আফগানিস্তান বৃহস্পতিবার লাহোরে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির গ্রুপ বি-তে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে। এই ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডের অনেক সংসদ সদস্য দাবি করেছিলেন যে তালিবানের মহিলাদের প্রতি আচরণের প্রতিবাদে ইংল্যান্ড পুরুষ দলের এই ম্যাচ বয়কট করা উচিত। তবে, ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড (ইসিবি) জানিয়েছে যে তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) নিয়ম মেনে চলবে, কারণ এই টুর্নামেন্টটি বিশ্ব ক্রিকেট সংস্থার আয়োজনে হচ্ছে। ইসিবি আরও বলেছে যে তারা আফগানিস্তানের সঙ্গে কোনো দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলবে না।
এই বয়কটের দাবি কীভাবে তাদের খেলাকে প্রভাবিত করছে, এমন প্রশ্নের জবাবে শাহিদি বলেন, “আমরা ক্রিকেটার, আমরা ক্রীড়াবিদ। আমরা শুধু মাঠের মধ্যে যা করতে পারি তাই নিয়ন্ত্রণ করি। মাঠের বাইরে কী ঘটছে তা নিয়ে আমরা চিন্তা করি না। এটি আমাদের আত্মবিশ্বাসের উপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। আমরা কঠোর পরিশ্রম করি, ভালো নেট সেশন করি। আমরা শুধু এটাই ভাবি এবং মাঠে যা করতে পারি তাই করি।”
চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আফগানিস্তান তাদের প্রথম ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে ১০৭ রানে পরাজিত হয়েছে। সেমিফাইনালে যাওয়ার সম্ভাবনা বাঁচিয়ে রাখতে তাদের জন্য এখন প্রতিটি ম্যাচ জয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তালিবান শাসন ও মহিলা ক্রিকেটারদের দুর্দশা
২০২১ সালে তালিবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখল করার পর থেকে মহিলাদের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষা, ক্রীড়া এবং সামাজিক স্বাধীনতার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মহিলা ক্রিকেটারদের জন্য এটি একটি বিশাল ধাক্কা ছিল। ২০২০ সালে এসিবি ২৫ জন মহিলা ক্রিকেটারের সঙ্গে চুক্তি করেছিল, কিন্তু তালিবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের খেলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে বেশিরভাগ খেলোয়াড় দেশ ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ায় এই মহিলা ক্রিকেটাররা নতুন করে তাদের ক্রিকেট জীবন শুরু করার চেষ্টা করছেন। গত মাসে মেলবোর্নে একটি প্রদর্শনী ম্যাচে তারা অংশ নিয়েছিলেন, যা তাদের জীবনে একটি নতুন আশার আলো দেখিয়েছে। তবে, আফগানিস্তানে থাকা অন্য মহিলাদের জন্য পরিস্থিতি এখনও অন্ধকারাচ্ছন্ন। তালিবানের কঠোর নীতির কারণে মহিলারা কেবল খেলাধুলা নয়, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্র থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।
বয়কটের দাবি ও আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ইংল্যান্ডের সংসদ সদস্যদের বয়কটের দাবি এই প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে। তারা মনে করেন, আফগানিস্তান পুরুষ দলের সঙ্গে খেলা মানে তালিবানের নীতির প্রতি পরোক্ষ সমর্থন দেওয়া। প্রায় ১৬০ জন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ ইসিবি-কে চিঠি দিয়ে এই ম্যাচ বয়কটের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তবে, ইসিবি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা আইসিসি টুর্নামেন্টে অংশ নেবে, কারণ এটি বিশ্বব্যাপী ক্রিকেট সংস্থার আয়োজন। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক জস বাটলারও বলেছেন যে বয়কট কোনো সমাধান নয়, বরং এটি ক্রীড়াবিদদের শাস্তি দেওয়ার মতো হবে।
অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়া গত দুই বছরে আফগানিস্তানের সঙ্গে একটি টি-টোয়েন্টি সিরিজ এবং একটি টেস্ট ম্যাচ বাতিল করেছে। তবে তারা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে খেলার পরিকল্পনা করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রীড়ামন্ত্রী গেটন ম্যাকেঞ্জিও বয়কটের পক্ষে কথা বলেছিলেন, কিন্তু তাদের দলও শেষ পর্যন্ত খেলেছে।
শাহিদির দৃষ্টিভঙ্গি ও আফগান দলের লক্ষ্য
শাহিদি বারবার জোর দিয়েছেন যে তার দলের মনোযোগ শুধু মাঠের খেলার উপর। “আমরা শুধু ক্রিকেট খেলতে এসেছি। আমরা এখানে জিততে এসেছি, শুধু অংশ নিতে নয়,” তিনি বলেন। আফগানিস্তান গত কয়েক বছরে ক্রিকেটে অসাধারণ উন্নতি করেছে। ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপে তারা ইংল্যান্ড, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দলকে হারিয়েছিল। গত বছরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তারা সেমিফাইনালে পৌঁছেছিল।
তবে, মহিলা ক্রিকেটারদের দুর্দশা এবং তালিবানের নীতি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সম্প্রদায়ের জন্য একটি বড় প্রশ্ন তুলেছে। আইসিসি এখনও আফগানিস্তানের পুরুষ দলকে টুর্নামেন্টে খেলার অনুমতি দিচ্ছে, যদিও তাদের সদস্যপদের শর্ত অনুযায়ী মহিলা দল থাকা বাধ্যতামূলক। এই দ্বিচারিতা নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে।
শাহিদির বক্তব্যে মহিলা ক্রিকেটারদের প্রতি সমর্থন থাকলেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তার দলের হাতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষমতা নেই। আফগানিস্তানের পুরুষ ক্রিকেটাররা তাদের খেলার মাধ্যমে দেশের জন্য আনন্দ আনার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মহিলাদের জন্য ক্রিকেট এখনও একটি দূরের স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং আইসিসি-র উপর এখন দায়িত্ব রয়েছে এই পরিস্থিতির সমাধান করার। ততক্ষণ পর্যন্ত, শাহিদি ও তার দল মাঠে তাদের সেরাটা দেওয়ার দিকে মনোযোগী থাকবে।