বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক দূষণ এখন পরিবেশগত সংকট ছাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যাচ্ছে, মানুষের রক্ত, ফুসফুস এমনকি মস্তিষ্কেও ঢুকে পড়ছে মাইক্রোপ্লাস্টিক। ঠিক এই পরিস্থিতিতেই বিজ্ঞানীদের এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে।
গবেষকরা এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক শনাক্ত করেছেন, যারা প্লাস্টিককে ভেঙে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম। বিজ্ঞানীদের মতে, এই ক্ষুদ্র জীবেরা ভবিষ্যতে প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠতে পারে।
কোন ব্যাকটেরিয়া প্লাস্টিক খায়?
২০১৬ সালে জাপানের বিজ্ঞানীরা Ideonella sakaiensis নামে একটি ব্যাকটেরিয়ার সন্ধান পান, যা PET (প্লাস্টিক বোতলে ব্যবহৃত উপাদান) ভাঙতে পারে।
এই ব্যাকটেরিয়া দুটি বিশেষ এনজাইম তৈরি করে:
-
PETase
-
MHETase
এই এনজাইমগুলো প্লাস্টিকের দীর্ঘ পলিমার চেইন ভেঙে দেয় এবং শেষে সেটাকে সাধারণ রাসায়নিক উপাদানে পরিণত করে, যা ব্যাকটেরিয়ার শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
শুধু ব্যাকটেরিয়া নয়, ছত্রাকও প্লাস্টিক ভাঙে
গবেষণায় আরও দেখা গিয়েছে, কিছু ফাঙ্গাস বা ছত্রাক পলিথিন এবং পলিউরেথেনের মতো কঠিন প্লাস্টিক ভাঙতে পারে।
বিশেষ করে উষ্ণ ও আর্দ্র পরিবেশে এই ছত্রাকগুলোর কার্যক্ষমতা তুলনামূলক বেশি।
কেন এই আবিষ্কার এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বিশ্বে উৎপাদিত মোট প্লাস্টিকের মাত্র ৯–১০ শতাংশ রিসাইক্লিং হয়। বাকিটা জমে থাকে:
-
ল্যান্ডফিলে
-
নদী ও সমুদ্রে
-
মাটির গভীরে
প্লাস্টিক খেতে সক্ষম এই জীবগুলো ব্যবহার করা গেলে:
-
সমুদ্রে জমে থাকা প্লাস্টিক ধীরে ধীরে কমানো সম্ভব
-
প্রচলিত রিসাইক্লিংয়ের চেয়ে কম শক্তি খরচে প্লাস্টিক ভাঙা যাবে
-
মাইক্রোপ্লাস্টিক তৈরির ঝুঁকি কমানো যেতে পারে
তাহলে কি প্লাস্টিক সমস্যার সমাধান হয়ে গেল?
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এখনই নয়।
কারণ:
-
এই ব্যাকটেরিয়া খুব ধীরে প্লাস্টিক ভাঙে
-
সব ধরনের প্লাস্টিক এখনো ভাঙতে পারে না
-
খোলা পরিবেশে ছেড়ে দিলে ইকোসিস্টেমে প্রভাব পড়তে পারে
এই কারণে গবেষকরা এখন ল্যাবে জেনেটিকভাবে উন্নত এনজাইম তৈরির দিকে ঝুঁকছেন, যাতে শিল্প পর্যায়ে নিরাপদভাবে ব্যবহার করা যায়।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গবেষণা চলছে:
-
রিসাইক্লিং প্ল্যান্টে এনজাইম ব্যবহার
-
প্লাস্টিক বর্জ্যকে কাঁচামালে রূপান্তর
-
সার্কুলার ইকোনমি মডেল বাস্তবায়ন
বিশেষজ্ঞদের আশা, আগামী ১০–২০ বছরের মধ্যে এই প্রযুক্তি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য হতে পারে।
প্রকৃতির মধ্যেই কি লুকিয়ে ছিল সমাধান?
পরিবেশবিদদের মতে, মানুষ যে দূষণের জন্ম দিয়েছে, তার সমাধান প্রকৃতি নিজেই দেখিয়ে দিচ্ছে। প্লাস্টিক খেতে সক্ষম এই ক্ষুদ্র জীবেরা প্রমাণ করছে, বিজ্ঞান ও প্রকৃতির সমন্বয়ই ভবিষ্যতের পথ।
