রাশিয়ার রাস্তায় বাড়ছে আমুর বাঘের মৃত্যু, অস্তিত্ব সংকটে

রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের তাইগা অঞ্চলে আমুর বা সাইবেরিয়ান বাঘ (Amur Tigers) (প্যান্থেরা টাইগ্রিস আলটাইকা) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে, যা এই অঞ্চলে এই প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার…

Amur Tiger Conservation

রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের তাইগা অঞ্চলে আমুর বা সাইবেরিয়ান বাঘ (Amur Tigers) (প্যান্থেরা টাইগ্রিস আলটাইকা) সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে, যা এই অঞ্চলে এই প্রজাতির দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকার জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। একটি নতুন গবেষণায় এই ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে।

   

১৯৮০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে আমুর বাঘের সঙ্গে ২৬টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২২টি ঘটেছে সড়কে এবং ৪টি রেলপথে। গবেষণায় বলা হয়েছে, “১৯৮০ সাল থেকে প্রতি দশকে ৩-৪টি ঘটনা ঘটলেও, ২০২০-২০২৩ সময়কালে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা মোট ঘটনার ৪৬%। শীতকালে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে, ২৬টির মধ্যে ১৯টি (৭৩%), যার মধ্যে ১০টি জানুয়ারি মাসে। বাকি ৭টি ঘটনা এপ্রিল থেকে অক্টোবরের মধ্যে, যখন গড় তাপমাত্রা ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে থাকে। ৯টি ঘটনার সময় রেকর্ড করা হয়েছে, সবগুলোই সন্ধ্যা বা রাতে। রেলপথে ঘটে যাওয়া ৪টি ঘটনা শীতকালে (জানুয়ারি-মার্চ), ২০১৭-২০২৩ সময়কালে ঘটেছে। ১৪টি ঘটনায় প্রাপ্তবয়স্ক বাঘ, ৭টিতে অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ৫টিতে ৬ মাসের কম বয়সী শাবক জড়িত ছিল। যে ২০টি বাঘের লিঙ্গ চিহ্নিত হয়েছে, তার মধ্যে ১১টি পুরুষ এবং ৯টি মহিলা।”

Advertisements

এই তথ্যগুলো ভয়ঙ্কর, কারণ রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য আমুর বাঘের শেষ দুর্গ হিসেবে পরিচিত। ১৯৩০-৪০ দশকে অবৈধ শিকার এবং চিড়িয়াখানার জন্য ফাঁদে ফেলার কারণে এই প্রজাতির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গিয়েছিল, মাত্র ৪০-৫০টি বাঘ বেঁচে ছিল। বর্তমানে জনসংখ্যা স্থিতিশীল হয়ে ৩০০-৩৫০ প্রাপ্তবয়স্ক বাঘে পৌঁছেছে, তবুও আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়নের (আইইউসিএন) রেড লিস্টে এটি ‘বিপন্ন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত।
অবৈধ শিকার এবং বন্যপ্রাণী বাণিজ্য আমুর বাঘের জন্য সবচেয়ে তাৎক্ষণিক হুমকি হলেও, গবেষণায় সড়কের ক্ষতিকর প্রভাবের বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

সড়ক: প্রাণঘাতী পথ

রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে আমুর বাঘের বাসস্থানে সড়কের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। প্রিমোরস্কি ক্রাই এবং খাবারভস্কি ক্রাই অঞ্চলে সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ২৮,০০০ কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪,০০০ কিলোমিটার পাকা সড়ক। গবেষকদের মতে, “গাড়ির সংখ্যা, সড়ক ট্রাফিকের তীব্রতা এবং গতি বাড়ছে। সিখোতে-আলিন পর্বতমালায় সড়ক নেটওয়ার্কের একটি বড় অংশ দুর্গম অঞ্চলে বিস্তৃত, যেখানে অনেক সড়ক কাঠ সংগ্রহের জন্য নির্মিত হয়েছে, কোনো পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন ছাড়াই।”

সড়ক দিয়ে শিকারিরা দুর্গম বনাঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া, এটি সংরক্ষিত এলাকাগুলোকে খণ্ডিত করে, প্রাণীদের বিচ্ছিন্নতা এবং জিন প্রবাহ সীমিত করে। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণীদের মৃত্যু। গবেষণায় বলা হয়েছে, “গৌণ সড়কগুলোতে বন্যপ্রাণী পারাপারের ব্যবস্থা বা বাধা নেই, যা বাঘদের সড়কে প্রবেশে বাধা দেয়। পাকা মহাসড়কে শুধুমাত্র একটি বন্যপ্রাণী টানেল রয়েছে, প্রিমোরস্কি ক্রাইয়ের খাসানস্কি জেলায় (নারভিনস্কি টানেল)।”

গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, ২০২০-২০২৩ সময়কালে সড়ক দুর্ঘটনায় বাঘের মৃত্যু বৃদ্ধির পেছনে একটি বড় কারণ হলো অঞ্চলের বন্য শূকর জনসংখ্যায় আফ্রিকান সোয়াইন ফিভারের প্রাদুর্ভাব। বন্য শূকর আমুর বাঘের প্রধান শিকার। শিকারের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বাঘেরা প্রায়ই “আমুর ও উসুরি উপত্যকার মানব-নির্মিত ভূখণ্ডে” প্রবেশ করছে, যেখানে অঞ্চলের প্রধান মহাসড়ক ও রেলপথ অবস্থিত।

শীতকালে বেশি মৃত্যু

শীতকালে বাঘের সংঘর্ষে মৃত্যু বেশি হয়েছে কারণ এই সময়ে তাদের অনেক শিকার—যেমন এশিয়াটিক ব্যাজার, র‍্যাকুন কুকুর, এশিয়াটিক কালো ভাল্লুক এবং বাদামি ভাল্লুক—শীতঘুমে থাকে। গবেষকরা বলছেন, “দ্বিতীয়ত, বসন্তে জন্মানো খুরওয়ালা প্রাণী শীতকালে বড় হয়ে ওঠে এবং শিকার হওয়ার ঝুঁকি কমে। ফলে বাঘদের খাদ্যের জন্য দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়, প্রায়ই বসতি ও সড়কের কাছে চলে আসে। গভীর তুষারের কারণে তারা সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। এই সময়ে মানুষ ও বাঘের মধ্যে সংঘাতও বাড়ে। তৃতীয়ত, সড়কে তুষার ও বরফ গাড়ির ব্রেকিং দূরত্ব বাড়ায়, যা সংঘর্ষে বাঘের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।”

সমাধানের পথ

গবেষকরা উপসংহারে বলেছেন, বন্যপ্রাণী-বান্ধব সড়ক নকশা—যেমন পারাপার স্থান, টানেল এবং বেড়া—বাঘের মৃত্যু কমাতে অত্যন্ত জরুরি, বিশেষ করে সংরক্ষিত এলাকার কাছাকাছি। “সড়ক ট্রাফিক দুর্ঘটনা মোকাবিলায় কঠোর ট্রাফিক আইন প্রয়োগ, উন্নত সড়ক পরিকল্পনা এবং বাসস্থান সংরক্ষণ রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যে আমুর বাঘের দীর্ঘমেয়াদি বেঁচে থাকা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ,” বলছেন বিজ্ঞানীরা।

বাঘের ভবিষ্যৎ

আমুর বাঘের জন্য রাশিয়ার দূরপ্রাচ্য একটি জীবনরেখা। কিন্তু সড়ক বিস্তার, শিকার হ্রাস এবং মানবসৃষ্ট পরিবেশের চাপে এই প্রজাতি আবারও বিপদের মুখে। এই গবেষণা সতর্ক করে দিচ্ছে যে, সময়মতো পদক্ষেপ না নিলে এই মহিমান্বিত প্রাণীটির অস্তিত্ব হয়তো চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। সড়ক নির্মাণে পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা এবং স্থানীয় প্রশাসনের সচেতনতাই পারে আমুর বাঘকে বাঁচাতে।