
ওড়িশার মাটির নিচে কি লুকিয়ে রয়েছে ভারতের (Odisha)ইতিহাসের একেবারে আদিম অধ্যায়? এমনই এক চাঞ্চল্যকর সম্ভাবনা সামনে এসেছে সম্বলপুর জেলার রেডাখোলের ভিমমণ্ডলী পাহাড়ে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে এখানে মিলেছে প্রস্তর যুগের মানুষের বসবাসের স্পষ্ট চিহ্ন, যা বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ১০ হাজার বছরেরও বেশি পুরনো হতে পারে। এই আবিষ্কার সত্যি হলে, তা মোহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার ইন্দাস সভ্যতার থেকেও প্রাচীন এক মানবসভ্যতার সাক্ষ্য বহন করবে।

সম্প্রতি এই এলাকায় খননকাজ শুরু করেছে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ASI)। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা প্রাগৈতিহাসিক চিত্র, পাথরের তৈরি অস্ত্র ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সরঞ্জাম সামনে আসতেই তৎপর হয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ।
ভারতের প্রতিরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ করলেন রাহুল গান্ধী
গঙ্গাধর মেহের বিশ্ববিদ্যালয় এবং INTACH-এর গবেষকরাও এই খননে যুক্ত হয়েছেন। যদিও স্থানীয় লোককথায় ভিমমণ্ডলী অঞ্চলকে মহাভারতের যুগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, গবেষকদের মতে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব তারও বহু আগে সভ্যতার একেবারে শৈশবকালের।
অত্যন্ত ধীর গতিতে খননকাজ
ASI-এর সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট ডি বি গদনায়ক জানিয়েছেন, এই খনন অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনও ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে না। শুধুমাত্র হাতে খুঁড়ে প্রতিদিন প্রায় এক সেন্টিমিটার করে মাটি সরানো হচ্ছে, যাতে কোনও মূল্যবান নিদর্শন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
খননের প্রাথমিক পর্যায়েই মিলেছে পাথরের তৈরি ছুরি, বর্শা, তীরের ফলা, স্ক্র্যাপার ও সূচের মতো সরঞ্জাম। ASI দলের সদস্য অনিল স্বাইন জানান, “এই অস্ত্রগুলি স্পষ্টতই আধুনিক নয়। এগুলি দিয়ে চামড়া কাটার কাজ, শিকার এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা প্রয়োজন মেটানো হত।”
প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকলার নিদর্শন
ভিমমণ্ডলী এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪৫টিরও বেশি শিলা-আশ্রয় (রক শেল্টার) চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে প্রাচীন মানুষের আঁকা চিত্র ও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। গবেষকদের মতে, এই ছবিগুলি আঁকা হয়েছে প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে লোহা অক্সাইড, গাছের ছাল ও পাতা ব্যবহার করে।
এই ছবিতে ফুটে উঠেছে বনজ পরিবেশ, শিকার, মানবজীবনের দৈনন্দিন দৃশ্য। এগুলি শুধু শিল্পকলাই নয়, সেই সময়কার মানুষের জীবনযাত্রার এক নীরব দলিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চিত্রকর্ম ছিল একদিকে বিনোদন, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বার্তা রেখে যাওয়ার মাধ্যম।
জাতীয় ঐতিহ্যের দাবি
এখন কার্বন ডেটিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা এই নিদর্শনের প্রকৃত বয়স নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। এর মধ্যেই স্থানীয় বাসিন্দা ও ভিমমণ্ডল সংঘ দাবি তুলেছে, এই অঞ্চলকে অবিলম্বে জাতীয় ঐতিহ্য স্মৃতিস্তম্ভ (National Heritage Monument) হিসেবে ঘোষণা করা হোক। যদি এই আবিষ্কার বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়, তবে ভারতের সভ্যতার ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে—যেখানে ওড়িশার এই পাহাড়ি অঞ্চল হয়ে উঠবে মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র।




