সাত বছর পর তৃণমূল ঘরনায় শোভন চট্টোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন: কী বার্তা রাজনীতিতে?

কলকাতা: দীর্ঘ সাত বছর পর ফের রাজ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা ঘনিষ্ঠ সহচর, কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন…

sovan-chatterjee-mamata-banerjee-meeting-darjeeling

কলকাতা: দীর্ঘ সাত বছর পর ফের রাজ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ফিরলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একদা ঘনিষ্ঠ সহচর, কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী শোভন চট্টোপাধ্যায় (Sovan Chatterjee)। শুক্রবার রাজ্য সরকারের তরফে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, নিউটাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NKDA)-র চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা হয়েছে তাঁকে। নির্দেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি এই পদে বহাল থাকবেন।

নিউটাউনের নাগরিক ও পরিকাঠামোগত উন্নয়নের দায়িত্বে থাকা NKDA রাজ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। ২০০৭ সালের আইনে গঠিত এই কর্তৃপক্ষ মূলত কলকাতার পার্শ্ববর্তী এই নতুন শহরের ‘সিভিক বডি’ হিসেবেই কাজ করে। এতদিন এই সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন শীর্ষ আমলারা— দেবাশিস সেন এবং আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। এবার সেখানে রাজনীতিক শোভন চট্টোপাধ্যায়ের আগমন নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Advertisements

২০১৮ সালে মন্ত্রী ও মেয়রপদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর কার্যত রাজনীতির বাইরে চলে গিয়েছিলেন শোভন চট্টোপাধ্যায়। সে সময় ব্যক্তিগত জীবনের অস্থিরতা, স্ত্রীর সঙ্গে বিবাদ এবং সংবাদ শিরোনামে থাকা তাঁর সম্পর্কের টানাপড়েন তাঁকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে দিয়েছিল। তাঁর স্ত্রী রত্না চট্টোপাধ্যায় বর্তমানে তৃণমূলের বিধায়ক হলেও, তখন দলের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছিল শোভনের।

   

২০১৯ সালে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি, বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়কে সঙ্গে নিয়ে। দিল্লিতে বিজেপি সদর দফতরে তাঁদের দলবদলের সময় উপস্থিত ছিলেন জে.পি. নাড্ডা। কিন্তু বিজেপিতে প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পেয়ে ২০২১ সালের ভোটের আগেই রাজনীতিতে প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন শোভন। এরপর ২০২৩ সালে ভাইফোঁটার দিন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে তাঁর আগমন রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ফেলে দেয়। তখন থেকেই জল্পনা শুরু হয়— ‘শোভন কি ফের তৃণমূলে ফিরছেন?’

এবার সেই জল্পনা যেন বাস্তব রূপ পেল। এনকেডিএ চেয়ারম্যান পদে তাঁর নিয়োগকে রাজনৈতিক মহল মমতার কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে। তৃণমূল মুখপাত্র জয়প্রকাশ মজুমদার বলেন, “শোভনবাবু প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ। তাঁর অভিজ্ঞতা নিউটাউনের উন্নয়নে সহায়ক হবে।”

অন্যদিকে, বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার বলেন, “এটা রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত। এ বিষয়ে আমার কোনও মন্তব্য নেই।” রাজনৈতিক বিশ্লেষক উদয়ন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, “শোভন চট্টোপাধ্যায় শহুরে রাজনীতিতে অভিজ্ঞ মুখ। আরজিকর হাসপাতালের আন্দোলনের পর তৃণমূলের শহরাঞ্চলের ভোটব্যাঙ্কে যে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে সোভনের প্রত্যাবর্তন গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি সংগঠন ও প্রশাসন— দুই ক্ষেত্রেই দক্ষ।”

রাজনৈতিক মহলের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্ত তৃণমূলের শহুরে ইমেজ পুনর্গঠনের অংশ। নিউটাউনের মতো আধুনিক শহরের দায়িত্বে অভিজ্ঞ প্রশাসনিক ব্যাকগ্রাউন্ডসম্পন্ন এক প্রাক্তন মেয়রকে বসিয়ে সরকার স্পষ্টতই বার্তা দিতে চায়— উন্নয়নই মূল লক্ষ্য। শোভনের প্রত্যাবর্তন তাই শুধু ব্যক্তিগত পুনরুজ্জীবন নয়, বরং শহরভিত্তিক রাজনীতিতে তৃণমূলের নতুন দিকনির্দেশের প্রতীক।

Advertisements