নয়াদিল্লি/কলকাতা: বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসকে ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিলেন নির্বাসিত আওয়ামী লিগ (Awami League) নেতা বাহাউদ্দিন নাসিম। কলকাতায় এসে তিনি বিস্ফোরক অভিযোগ করেন যে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার “জঙ্গি ও অপরাধীদের মদত দিচ্ছে” এবং তার ফলেই বাংলাদেশে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা বাড়ছে। সংবাদ সংস্থা ANI-কে দেওয়া বক্তব্যে নাসিম দাবি করেন, শেখ হাসিনার সরকার উৎখাতের পর থেকে দেশ কার্যত দিশাহীন হয়ে পড়েছে।
নাসিমের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে অন্তত ২৫০টিরও বেশি তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। এর ফলে কয়েক দশ হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। তাঁর দাবি, শেখ হাসিনার আমলে যেখানে ধারাবাহিকভাবে ৮ শতাংশের বেশি জিডিপি বৃদ্ধির হার বজায় ছিল, সেখানে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অর্থনীতি দ্রুত নিম্নমুখী। শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ কমছে, বৈদেশিক আস্থা ভেঙে পড়ছে এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কলকাতায় দাঁড়িয়ে আওয়ামী লিগের এই নেতা আরও বলেন, “এই সরকার শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থ নয়, বরং অপরাধীদের রক্ষা করছে। সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনায় পুলিশ কার্যত অসহায় দর্শকের ভূমিকায়।” তাঁর অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের উপর হামলা বেড়েছে এবং বহু ক্ষেত্রে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করছে না বা করতে পারছে না। তিনি সাম্প্রতিক একটি ঘটনাকে সামনে এনে বলেন, ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে এক হিন্দু পোশাকশ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা গোটা দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রথমে ঘটনাটিকে ভুলভাবে পুলিশকর্মী হত্যার ঘটনা বলে প্রচার করা হলেও পরে প্রকৃত তথ্য সামনে আসে। নাসিমের দাবি, এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে সংখ্যালঘুরা ক্রমশ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
আওয়ামী লিগ নেতার বক্তব্যে আরও বলা হয়, দেশে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় উগ্রতা ও সহিংসতার আবহে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে। তাঁর অভিযোগ, “জঙ্গি ও মৌলবাদী শক্তির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাদের প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে।” যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এই ধরনের অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে এবং বলেছে, তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
কলকাতায় এসে এই বক্তব্য দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক তাৎপর্যও দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। নাসিম স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াইয়ে আওয়ামী লিগ ভারতের সমর্থন চাইছে। তাঁর কথায়, “ভারত সব সময় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশে ছিল। আজও সেই সমর্থন জরুরি।” সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে অশান্তি বেড়ে যাওয়ায় ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ডিসেম্বর ২০২৫ জুড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় নতুন করে অশান্তির খবর সামনে এসেছে। এর জেরে সরকার দেশজুড়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা জারি করেছে। একাধিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও বিরোধীদের দাবি, পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, কলকাতায় এসে এই ধরনের বক্তব্য রেখে আওয়ামী লিগ আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। বিশেষ করে ভারতীয় গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহলে বার্তা পৌঁছে দেওয়াই তাদের উদ্দেশ্য। অন্যদিকে, ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠরা বলছেন, এই সব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল মাত্র।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকট, শ্রমিক অসন্তোষ, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং জঙ্গি কার্যকলাপ—সব মিলিয়ে দেশ এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বলে দাবি করছে আওয়ামী লিগ। কলকাতা থেকে দেওয়া বাহাউদ্দিন নাসিমের এই বক্তব্য যে আগামী দিনে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে, তা বলাই বাহুল্য।
