
সংসদে শীতকালীন অধিবেশনের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে আলোচনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই। কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর অভিযোগের জবাবে মঙ্গলবার রাজ্যসভায় স্পষ্টবার্তা দিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর দাবি, বাংলার নির্বাচনী রাজনীতিকে মাথায় রেখে বিজেপি এই আলোচনা ডেকে এনেছে—এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। “বন্দে মাতরম নিয়ে আলোচনা নির্বাচনসংশ্লিষ্ট—এমন ধারণা যাঁদের, তাঁদের বিষয়টি নতুন করে ভাবা উচিত,” মন্তব্য শাহের।
প্রিয়াঙ্কার অভিযোগ ও শাহের পাল্টা জবাব
লোকসভায় সোমবার প্রিয়াঙ্কা গান্ধী প্রশ্ন তুলেছিলেন—কেন ‘বন্দে মাতরম’-এর ছ’টি স্তবকের মধ্যে কেবল দু’টি গ্রহণ করা হয়েছিল, সেই নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তোলাকে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সংবিধান প্রণেতাদের সিদ্ধান্তকে “অপমান” বলে মনে করেন। তাঁর বক্তব্যে জবাব দেন অমিত শাহ।
শাহ বলেন, এই সঙ্গীতই ভারতের “সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে জাগ্রত করার মন্ত্র” ছিল। তিনি অভিযোগ করেন, ১৯৩৭ সালে জওহরলাল নেহরু ইচ্ছাকৃতভাবে স্তবক বিভাজন করেন, যা তাঁর কথায় “তুষ্টিকরণ রাজনীতির সূচনা”, এবং যার “পরিণতি হয়েছিল দেশের বিভাজনে”।
খারগের আক্রমণ: ‘সমস্যা ঢাকতেই বিতর্ক’ Vande Mataram Controversy
অমিত শাহের বক্তব্যের পরেই রাজ্যসভায় সওয়াল জুড়ে দেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খারগে। তিনি বলেন, দেশের বাস্তব সমস্যা থেকে নজর ঘোরাতেই এই বিতর্ক তৈরি করছে সরকার।
খারগের মন্তব্য, “প্রধানমন্ত্রী এবং অমিত শাহ সুযোগ পেলেই নেহরুজিকে অপমান করেন। কিন্তু তা আশ্চর্যের নয়, কারণ প্রধানমন্ত্রী যেখানে যান, অমিত শাহও তাঁর পিছনেই থাকেন!”
সঙ্গে তাঁর অভিযোগ—সংবিধান ও কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সম্মিলিত সিদ্ধান্তকে আজ শুধুমাত্র নেহরুর নামে টার্গেট করা হচ্ছে।
বিতর্কের পটভূমি: কেন শুধু প্রথম দুটি স্তবক?
বিতর্কের কেন্দ্রে মূলত দুটি প্রশ্ন—
১) কেন কেবল প্রথম দু’টি স্তবককে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা হল?
২) বাংলার রাজনীতির সঙ্গে এর কী যোগ?
ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়—পরবর্তী চারটি স্তবকে সরাসরি হিন্দু দেবী-দেবতার উল্লেখ থাকায় বহুধর্মীয় ভারতের বাস্তবতার সঙ্গে প্রথম দু’টি স্তবকই সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করেছিলেন গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৫০ সালে সংবিধানে সেই সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়।
অমিত শাহের অভিযোগ, এই সিদ্ধান্তে নেহরু একাই দায়ী। কিন্তু খারগে বলেন, সিদ্ধান্তটি ছিল সম্মিলিত এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও প্রথম দুটি স্তবককে আলাদা করে গ্রহণ করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
বঙ্গে ভোটের ঠিক আগে নতুন উত্তাপ
শাহের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে বাংলা—কারণ বাংলায় ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটকে কেন্দ্র করে ‘বন্দে মাতরম’-এর রাজনীতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রীর আগের বক্তৃতাতেও তিনি অভিযোগ করেছিলেন, মুসলিম লিগ নেতা জিন্নাহর আপত্তির জেরে স্তবক বাছাই করা হয়েছিল—যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দানা বেঁধেছে।
বন্দে মাতরম নিয়ে আলোচনা সাংসদীয় পরিসরে যতই আদর্শিক হোক, ততটাই স্পষ্ট—বঙ্গে ভোটের আগে জাতীয় সঙ্গীতের আবেগ ও সাংস্কৃতিক ভাবনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বেড়েছে। শাহ–প্রিয়াঙ্কা–খারগের এই ত্রিমুখী বাকযুদ্ধেই তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল।










