কতটুকু নিকৃষ্ট হলে… সিডনি জঙ্গি হামলায় ভারত-যোগে বিস্ফোরক তসলিমা

Taslima Nasrin Criticizes

সিডনিতে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলাকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। ফেসবুকে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি কেবল ঘটনার নিন্দাই করেননি, বরং জঙ্গিবাদ, পরিবার-প্রভাব, ধর্মীয় চরমপন্থা এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে কড়া ভাষায় মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে অভিযুক্তদের পারিবারিক শেকড়, ধর্মীয় শিক্ষার প্রভাব এবং আধুনিক রাষ্ট্রে বেড়ে ওঠার পরও কীভাবে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়া সম্ভব—এই প্রশ্নগুলো।

তসলিমা নাসরিন তাঁর পোস্টে লেখেন, “কতটুকু নিকৃষ্ট হলে পিতা নিজে জঙ্গি হতে পারে এবং তার পুত্রকে জঙ্গি বানাতে পারে!”—এই প্রশ্ন তুলে তিনি পরিবারকে উগ্রবাদে ‘প্রথম পাঠশালা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, অভিযুক্তদের একজন অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম ও বেড়ে ওঠার সুযোগ পেলেও পারিবারিক বিশ্বাস, ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র এবং জঙ্গি মতাদর্শের প্রভাবে অল্প বয়সেই সহিংস পথে পা বাড়িয়েছে। লেখিকার ভাষায়, আধুনিক ও সভ্য রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকেও কারও এমন চরমপন্থায় জড়িয়ে পড়া বিস্ময়কর ও ভয়ংকর।

   

এই পোস্টে তিনি অভিযুক্তদের পরিচয় প্রসঙ্গে ভারতের সঙ্গে যোগসূত্র টানেন এবং দেশভাগ-পরবর্তী প্রজন্মের বাস্তবতা তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে, কেউ কেউ প্রথমে অভিযুক্তদের পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের বলে ভেবেছিলেন, কিন্তু তাঁদের শেকড় ভারতের ভেতরেই। লেখিকার মতে, এই তথ্য নতুন করে প্রশ্ন তোলে—ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জঙ্গিবাদের বীজ অঙ্কুরিত হয়।

পোস্টে তিনি দক্ষিণ এশিয়ায় জঙ্গিবাদের বিস্তারের প্রসঙ্গও তোলেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা দুর্বল, গণতন্ত্র সংকুচিত এবং ধর্মকে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়, সেখানে উগ্রবাদ বাড়ার ঝুঁকি বেশি। তবে ভারতের মতো বৃহৎ ও বৈচিত্র্যময় দেশে—যেখানে প্রায় ২০ কোটি মুসলমান বাস করেন—সেখানে অল্পসংখ্যক মানুষের উগ্রপন্থায় জড়ানোকে ‘সংখ্যাগতভাবে নগণ্য’ বললেও তিনি জোর দেন, “একজনও জঙ্গি হওয়া কাম্য নয়।”

তসলিমা নাসরিন তাঁর পোস্টে আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্কের প্রসঙ্গ এনে বলেন, ভারতের নাগরিকদের কেউ কেউ অতীতে আল কায়দা-র দক্ষিণ এশীয় শাখা কিংবা আইসিস-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—এমন অভিযোগ ও মামলার কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে। তিনি উদাহরণ টেনে বোঝাতে চান, কেবল দারিদ্র্য বা অশিক্ষা নয়; পরিবার, মতাদর্শিক প্রশিক্ষণ এবং পরিচয়-সংকট মিলিয়ে একজন তরুণকে চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

লেখিকার বক্তব্যে ২০১৬ সালের ঢাকার গুলশান ক্যাফে হামলার স্মৃতিও উঠে আসে। তিনি তুলনা টেনে বলেন, সে সময়ও শিক্ষিত ও তুলনামূলক স্বচ্ছল পরিবারের তরুণরা সহিংসতায় জড়িয়েছিল। তাঁর মতে, অস্ট্রেলিয়ার বণ্ডাই বিচের ঘটনা হোক বা ঢাকার গুলশান—উদ্দেশ্য একটাই ছিল নিরীহ মানুষের ওপর আঘাত। এই তুলনার মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চান, ভূগোল বদলালেও উগ্রবাদী আদর্শের ধরণ বদলায় না।

তসলিমা নাসরিন ধর্মীয় চরমপন্থা নিয়ে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, কোনো ধর্মীয় ব্যাখ্যা যদি মানুষকে সহিংসতা, ঘৃণা ও হত্যায় প্ররোচিত করে, তবে সেই ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে সমাজকে দাঁড়াতেই হবে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বে প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান থাকা সত্ত্বেও অল্পসংখ্যক মানুষই উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে যুক্ত—এর কারণ আধুনিক আইন, মানবাধিকারভিত্তিক সমাজব্যবস্থা ও বিবেকবান মানুষের নৈতিক শিক্ষার প্রভাব। তাঁর যুক্তি, যদি সবাই অক্ষরে অক্ষরে সহিংস নির্দেশ পালন করত, তবে পৃথিবী বহু আগেই ধ্বংস হয়ে যেত।

পোস্টের শেষাংশে তিনি সমাধানের পথ হিসেবে বিজ্ঞানমনস্কতা, মানবধর্ম এবং রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারকে ধর্মের প্রভাব থেকে আলাদা রাখার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, কেবল আইনশৃঙ্খলা দিয়ে নয়; শিক্ষা, যুক্তিবাদ ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমেই জঙ্গিবাদের শিকড় দুর্বল করা সম্ভব।

এদিকে, লেখিকার এই মন্তব্যকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমর্থকদের একাংশ মনে করছেন, তিনি অস্বস্তিকর হলেও জরুরি প্রশ্ন তুলেছেন। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, তাঁর ভাষা অতিরিক্ত সাধারণীকরণ ও আক্রমণাত্মক। সব মিলিয়ে, সিডনির বিস্ফোরণকে কেন্দ্র করে তসলিমা নাসরিনের পোস্ট আবারও ধর্ম, উগ্রবাদ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে বিতর্ককে উসকে দিল।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন