সুপ্রিম কোর্টের মোক্ষম প্রশ্নে প্যাঁচে নির্বাচন কমিশন

নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাগরিকত্ব যাচাই (Supreme Court)এই দুই সংবেদনশীল বিষয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট ফের একবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলল নির্বাচন কমিশনের (ECI) ভূমিকা…

supreme-court-voter-verification-eci-citizenship

নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাগরিকত্ব যাচাই (Supreme Court)এই দুই সংবেদনশীল বিষয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সুপ্রিম কোর্ট ফের একবার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলল নির্বাচন কমিশনের (ECI) ভূমিকা ও ক্ষমতা নিয়ে। সাম্প্রতিক এক শুনানিতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানতে চেয়েছে, যাঁরা একাধিকবার ভোটার তালিকা সংশোধনের মধ্য দিয়ে টিকে গেছেন, তাঁদের কি স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নাগরিক হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না?

Advertisements

আদালতের এই প্রশ্ন শুধু প্রশাসনিক নয়, সরাসরি যুক্ত নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে। বিচারপতিরা স্পষ্ট করে স্মরণ করিয়ে দেন ১৯৯৫ সালের একটি সুপ্রিম কোর্টের রায়, যেখানে বলা হয়েছিল একবার বৈধভাবে ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হলে, সেই ব্যক্তিকে বারবার নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বাধ্য করা যায় না। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, “ভোটার তালিকায় দীর্ঘদিন ধরে নাম থাকা মানেই তো রাষ্ট্র তাকে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।”

   

তাবলিগ জামাতের নাম করে বাংলাদেশে বেলাগাম জঙ্গি অনুপ্রবেশ

এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যও উঠে আসে শুনানিতে। কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২০০৩ সালের ভোটার তালিকাকে ‘প্রোবেটিভ’ বা প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়েছিল। অর্থাৎ, যাঁদের নাম ওই তালিকায় ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রে নতুন করে যাচাই করা হয়নি। কেবলমাত্র যাঁদের নাম ওই তালিকায় অনুপস্থিত ছিল, তাঁদের ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত যাচাই বা প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

বিহারের উদাহরণ টেনে নির্বাচন কমিশন জানায়, বিহারের তালিকা সংশোধনে প্রায় ৬৫ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশনের দাবি, এই বাদ পড়া নামগুলির ক্ষেত্রে কোনো আপিল জমা পড়েনি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, ওই ভোটাররা ইতিমধ্যেই মারা গেছেন, অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়েছেন বা একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার তালিকায় ছিল যাকে ‘ডুপ্লিকেট এন্ট্রি’ বলা হয়।

তবু আদালতের প্রশ্ন এখানেই থামেনি। বিচারপতিরা জানতে চান, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নাগরিকের অধিকার কতটা সুরক্ষিত হচ্ছে। আদালতের ভাষায়, “ভুল সংশোধন জরুরি, কিন্তু তার আড়ালে যেন বৈধ ভোটার বাদ না পড়ে।” এই মন্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সাংবিধানিক ভারসাম্য রক্ষার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছে।

শুনানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘গঠনমূলক প্রশ্ন’ ওঠে নির্বাচন কমিশনকে কি পুরোপুরি স্বাধীনভাবে ডুপ্লিকেট নাম সরানোর সুযোগ দেওয়া উচিত? নাকি প্রতিটি বড় সংশোধনের ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের নজরদারি প্রয়োজন? এখানেই আসে আরেকটি মৌলিক বিতর্ক বিচারিক তদারকি কোথায় শেষ হবে, আর নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা কোথা থেকে শুরু হবে?

সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিতর্ক নতুন নয়, তবে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। একদিকে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা বজায় রাখা জরুরি, অন্যদিকে নাগরিকের ভোটাধিকার যেন প্রশাসনিক ত্রুটির শিকার না হয়, সেটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, সুপ্রিম কোর্টের এই প্রশ্নগুলি ভবিষ্যতে ভোটার যাচাই সংক্রান্ত নীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। আদালত সরাসরি কোনো নির্দেশ না দিলেও, কমিশনের কাজকর্মের সীমা ও দায়িত্ব নিয়ে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো ভোটার।

আর সেই ভিত্তিকে অযথা সন্দেহের চোখে দেখা যায় না। সব মিলিয়ে, এই শুনানি ভারতীয় গণতন্ত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ভোটার তালিকার শুদ্ধতা এবং নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য এই দুইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আগামী দিনের নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা।

Advertisements