বিতর্ক উস্কে টাকার বিনিময়ে শীর্ষ আদালতে শেষ হল পলাতক শিল্পপতিদের মামলা

sandesara-brothers-supreme-court-deposit-debate

ভারতের আর্থিক অপরাধ ও কর্পোরেট জালিয়াতি নিয়ে ফের নতুন করে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে (Sandesara brothers)। বহু বছর ধরে পলাতক ঘোষিত শিল্পপতি নীতিন ও চেতন সন্দেসারা সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে ৫,১০০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার পর প্রশ্ন উঠছে—ভারতে কি বড় আর্থিক অপরাধ শেষ পর্যন্ত অর্থ দিয়েই মিটিয়ে ফেলা যায়? এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোড়ন।

সন্দেসারা ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে একসময় সিবিআই, ইডি, এসএফআইও এবং ফিউগিটিভ ইকোনমিক অফেন্ডারস অ্যাক্ট (FEOA)-এর অধীনে একাধিক গুরুতর মামলা দায়ের হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, তারা প্রায় ৫,৩৮৩ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ খেলাপি করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত, সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক স্তরে প্রত্যর্পণের চেষ্টা চললেও, মামলার কোনও চূড়ান্ত পরিণতি চোখে পড়েনি।

   

আকাশ ঘিরে রেখেছে ‘লাল দানব’! বজ্রপাতের পর দেখা গেল রহস্যময় ‘লাল পরী’

এবার সুপ্রিম কোর্টে ৫,১০০ কোটি টাকা জমা দেওয়ার ফলে পরিস্থিতি কার্যত নতুন মোড় নিয়েছে। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, এই অর্থ জমা পড়ার পর সন্দেসারা ভ্রাতৃদ্বয়ের বিরুদ্ধে থাকা বহু আর্থিক মামলার নিষ্পত্তির পথ প্রশস্ত হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই মামলায় মোট উদ্ধার হওয়া অর্থের পরিমাণ ইতিমধ্যেই পৌঁছেছে প্রায় ৯,৭৯৯ কোটি টাকায়—যা মূল ঋণ খেলাপির অঙ্কের তুলনায় অনেকটাই বেশি।

এই ঘটনাই নতুন করে প্রশ্ন তুলছে আইনের চোখে বড় আর্থিক অপরাধের শাস্তি কি শেষ পর্যন্ত টাকার অঙ্কেই সীমাবদ্ধ? সমালোচকদের মতে, বার্তা অত্যন্ত ভয়ংকর: “লুট করো, পালাও, দর কষাকষি করো, টাকা দাও, আর মুক্ত হয়ে যাও।” সাধারণ মানুষের কাছে এর ফলে যে বার্তা যাচ্ছে, তা বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থাকে দুর্বল করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে।

বিশেষজ্ঞদের একাংশের যুক্তি, সরকারের দিক থেকে লক্ষ্য ছিল অন্তত জনগণের টাকা উদ্ধার করা। বছরের পর বছর মামলা চললেও যদি টাকা ফেরত না আসে, তাহলে সেটাও তো ব্যর্থতা। সেই দিক থেকে দেখলে, প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা উদ্ধার হওয়া একটি বড় সাফল্য। তবে অপর পক্ষের দাবি, শুধু অর্থ উদ্ধারই যথেষ্ট নয়—অপরাধের শাস্তি, দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ আরও বাড়তে পারে।

আইনজীবী ও প্রাক্তন তদন্তকারী আধিকারিকদের মতে, এই ধরনের সমঝোতা ভবিষ্যতে অন্যান্য পলাতক শিল্পপতিদের জন্যও পথ খুলে দিতে পারে। তারা প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে কি বিজয় মালিয়া, নীরব মোদি বা অন্য পলাতক অভিযুক্তরাও একই পথে হেঁটে শেষ পর্যন্ত আইনের কঠোরতা এড়াতে পারবেন? এতে করে ফিউগিটিভ ইকোনমিক অফেন্ডারস অ্যাক্টের মতো আইনের কার্যকারিতাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। বিরোধীদের অভিযোগ, বড় শিল্পপতিদের ক্ষেত্রে আইন নরম হয়ে যায়, আর সাধারণ নাগরিকের জন্য তা কঠোরই থেকে যায়। অন্যদিকে সরকারপক্ষের যুক্তি, আদালতের নির্দেশ মেনেই প্রক্রিয়া এগিয়েছে এবং দেশের অর্থ ফেরত আনা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

সব মিলিয়ে সন্দেসারা ভ্রাতৃদ্বয়ের সুপ্রিম কোর্টে বিপুল অঙ্কের টাকা জমা দেওয়া শুধু একটি আইনি ঘটনা নয়, এটি ভারতের আর্থিক অপরাধ দমন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। অর্থ ফেরত পাওয়া কি শেষ কথা, নাকি ন্যায়বিচারের আসল পরীক্ষাটা এখনও বাকি—এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে দেশজুড়ে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন