
জার্মানির বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী দেশের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে তীব্র অভিযোগ তুলেছেন। বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে এমন কড়া সমালোচনা ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। রাহুল গান্ধীর দাবি, ভারতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর “পূর্ণমাত্রার আক্রমণ” চলছে এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।
বার্লিনে প্রবাসী ভারতীয়দের এক সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল গান্ধী বলেন, হরিয়ানার নির্বাচনে কংগ্রেস প্রকৃতপক্ষে জয়ী হয়েছে, কিন্তু সেই ফলাফলকে মান্যতা দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের নির্বাচনকে তিনি “অন্যায্য” বলে অভিহিত করেন। তাঁর অভিযোগ, ভোটার তালিকায় ব্যাপক অনিয়ম রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ভোটার তালিকায় নাকি এক “ব্রাজিলিয়ান মহিলা”র নাম ২২ বার অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এখন আর স্বাধীনভাবে কাজ করছে না। তাঁর দাবি, নির্বাচন কমিশন, তদন্তকারী সংস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
বিরোধী দলনেতা আরও বলেন, বর্তমানে ভারতের রাজনীতি আসলে “দুটি ভিন্ন ভারতের ভাবনার সংঘর্ষ”। একদিকে রয়েছে সংবিধান, বহুত্ববাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক ন্যায়ের ধারণা; অন্যদিকে রয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং ভিন্নমতকে দমন করার প্রবণতা। তাঁর মতে, বিরোধী শিবির এই দ্বিতীয় প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, যা শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, বরং ভারতের ভবিষ্যৎ রক্ষার লড়াই। বিদেশের মাটিতে এমন বক্তব্য রাখার পরেই তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডার নেতৃত্বে বিজেপি রাহুল গান্ধীর অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে আখ্যা দেয়। বিজেপির অভিযোগ, রাহুল গান্ধী বিদেশে ভারতের গণতন্ত্র ও সংবিধানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করছেন।
বিজেপির পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার জন্য দেশের ভেতরে সাংবিধানিক ও আইনি পথ খোলা রয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা দেশের সম্মান ক্ষুণ্ণ করে। এই প্রসঙ্গে বিজেপি রাহুল গান্ধীর বক্তব্যকে কটাক্ষ করে “ভারত বদনাম যাত্রা” বলে উল্লেখ করে। জে পি নাড্ডা বলেন, ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে ভারতের সুনাম রয়েছে। তাঁর দাবি, নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে না পেরেই কংগ্রেস নেতৃত্ব বারবার প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করছে। বিজেপির মতে, এই ধরনের মন্তব্য দেশের সংবিধান ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে।
এই ঘটনার পর কংগ্রেস ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও তীব্র হয়েছে। একদিকে কংগ্রেস নেতৃত্ব নির্বাচনী স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার প্রশ্ন তুলছে, অন্যদিকে বিজেপি এই অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে খারিজ করছে। ফলে আসন্ন দিনগুলোতে নির্বাচন, গণতন্ত্র এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে বিতর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।










