
বার্লিন: জার্মানির মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন কংগ্রেস সাংসদ তথা লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ তুলে তিনি দাবি করেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এসে দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যত দলীয় স্বার্থে কব্জা করেছে।
রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ব্যবহার করা হয় ইডি-সিবিআই
গত সপ্তাহে বার্লিনের হার্টি স্কুলে এক আলোচনাসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল গান্ধীর অভিযোগ, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) এবং সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই)-এর মতো সংস্থাগুলিকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন করতে ব্যবহার করা হচ্ছে, অথচ শাসক দলের ঘনিষ্ঠদের ক্ষেত্রে এই সংস্থাগুলি কার্যত নিষ্ক্রিয়।
রাহুলের ভাষায়, “আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর সর্বাত্মক দখল চলছে। গোটা ব্যবস্থাটার উপর পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালানো হচ্ছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, “আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা, ইডি এবং সিবিআইকে পুরোপুরি অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। বিজেপির বিরুদ্ধে ইডি-সিবিআইয়ের কার্যত কোনও মামলাই নেই। অথচ প্রায় সব রাজনৈতিক মামলাই তাদের বিরুদ্ধে, যারা বিজেপির বিরোধিতা করে।”
লোকসভার বিরোধী দলনেতার অভিযোগ এখানেই থামেনি। তাঁর দাবি, কোনও ব্যবসায়ী যদি কংগ্রেসকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁকেও হুমকির মুখে পড়তে হয়। রাহুলের মতে, দেশের প্রতিষ্ঠানগুলি আর তাদের সাংবিধানিক ভূমিকা অনুযায়ী কাজ করছে না।
নিজেদের সম্পত্তি করেছে বিজেপি
তিনি বলেন, “কংগ্রেস এই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করতে সাহায্য করেছে। আমরা কখনও এগুলিকে ‘আমাদের প্রতিষ্ঠান’ বলে দেখিনি—এগুলি দেশের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বিজেপি এগুলিকে নিজেদের সম্পত্তি হিসেবে দেখে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।”
গণতন্ত্র যে গভীর সংকটে, সেই কথাও জোর দিয়ে বলেন রাহুল গান্ধী। তাঁর বক্তব্য, “আমরা বিজেপির বিরুদ্ধে লড়ছি না, আমরা লড়ছি ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর তাদের দখলের বিরুদ্ধে। এবং এই লড়াইয়ে আমরা বিরোধী শক্তির একটি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলব, যা সফল হবে।”
ভোটচুরির অভিযোগ ফের সামনে
বক্তৃতার এক পর্যায়ে ফের ‘ভোট চুরি’র অভিযোগ তোলেন কংগ্রেসের এই শীর্ষ নেতা। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচন বিজেপির পক্ষে কারচুপি করা হয়েছিল। এই অভিযোগ তিনি আগেও একাধিকবার তুলেছেন।
রাহুল বলেন, “আমরা তেলেঙ্গানা, হিমাচল প্রদেশে নির্বাচন জিতেছি। কিন্তু ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলছি। হরিয়ানার নির্বাচনে আমরা যে জিতেছি, তার প্রমাণ আমরা সন্দেহাতীতভাবে তুলে ধরেছি। এমনকি মহারাষ্ট্রের নির্বাচনও ন্যায্য ছিল বলে আমরা মনে করি না।”
তিনি জানান, ভোটার তালিকায় ডুপ্লিকেট নামসহ একাধিক অনিয়মের প্রমাণ নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরা হলেও কোনও জবাব পাওয়া যায়নি।
রাহুলের মন্তব্য, “আমরা মৌলিকভাবে বিশ্বাস করি, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় গুরুতর সমস্যা রয়েছে।”
‘দুই দর্শনের সংঘর্ষ’
অর্থনীতি নিয়েও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের বিরুদ্ধে কড়া সমালোচনা করেন রাহুল গান্ধী। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি ও আরএসএস আসলে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের অর্থনৈতিক নীতিরই সম্প্রসারণ করেছে, নতুন কোনও দিশা দেখাতে পারেনি।
রাহুলের দাবি, মোদী সরকারের অর্থনৈতিক মডেল এখন কার্যত অচল গলিতে পৌঁছেছে এবং আর ফল দিতে সক্ষম নয়।
তিনি স্বীকার করেন, বহু মানুষ প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সমর্থন করেন। তবে তাঁর মতে, দেশের এক বড় অংশ এই আদর্শ ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে একমত নয়। রাহুলের সতর্কবার্তা, এই দর্শন দেশকে গভীর সামাজিক বিভাজনের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
“আমাদের বিশ্বাস, এই দর্শন ব্যর্থ হবে। এতে ভারতের ভিতরে প্রবল টানাপোড়েন তৈরি হবে, মানুষে-মানুষে সংঘর্ষ বাড়বে। এটাই ভারতে দুই ভিন্ন দর্শনের সংঘর্ষ,” বলেন তিনি।
জার্মানি সফরের প্রেক্ষাপট
পাঁচ দিনের জার্মানি সফরে রাহুল গান্ধী বার্লিনে প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। পাশাপাশি জার্মানির ভাইস চ্যান্সেলর লার্স ক্লিংবাইল এবং প্রাক্তন চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎসের সঙ্গে পৃথক বৈঠকও করেন তিনি।
এছাড়া একটি বিএমডব্লিউ কারখানা পরিদর্শন করে ভারতের উৎপাদন ক্ষেত্রের সম্ভাবনা ও উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কথা বলেন কংগ্রেস নেতা।
বিদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে এই ধারালো রাজনৈতিক বার্তা যে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক উসকে দেবে, তা বলাই বাহুল্য।










