অবিজেপি শাসিত রাজ্যের একাধিক শহরে নিষিদ্ধ মদ-মাংস-তামাক

ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষায় কড়া সিদ্ধান্ত, প্রশংসার পাশাপাশি উঠছে বাস্তবতার প্রশ্ন

punjab-bans-alcohol-meat-tobacco-religious-cities-aap-government

দেশের রাজনীতিতে যেখানে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিতে ধর্মীয় বিধিনিষেধ নিয়ে প্রায়শই বিতর্ক দেখা যায়, সেখানে এবার নজির গড়ল এক অবিজেপি শাসিত রাজ্য। পাঞ্জাবে (Punjab) আম আদমি পার্টি (AAP) সরকারের নেতৃত্বে মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত মান সম্প্রতি রাজ্যের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ শহরে মদ, মাংস, তামাক ও অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য বিক্রির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন। এই সিদ্ধান্ত ঘিরে যেমন ধর্মীয় মহলে প্রশংসা হচ্ছে, তেমনই অর্থনীতি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি হওয়া এই নির্দেশে পাঞ্জাবের অমৃতসর ওয়াল্ড সিটি, তলওয়ান্ডি সাবো এবং শ্রী আনন্দপুর সাহিব—এই তিন শহরে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, এই তিনটি স্থানই শিখ ধর্মের অত্যন্ত পবিত্র অঞ্চল। শ্রী আনন্দপুর সাহিব ও তলওয়ান্ডি সাবো শিখদের পাঁচটি তখ্‌তের মধ্যে তিনটির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। সরকারের দাবি, গুরু তেগ বাহাদুরের ৩৫০তম শহিদ দিবস উপলক্ষে বিধানসভায় গৃহীত প্রস্তাবের ভিত্তিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

   

ধর্মীয় মর্যাদা ও শৃঙ্খলার যুক্তি

রাজ্য সরকারের বক্তব্য, এই নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ধর্মীয় পবিত্রতা রক্ষা এবং তীর্থযাত্রীদের জন্য একটি শালীন ও সংযত পরিবেশ তৈরি করা। বিশেষ করে অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই মদ ও তামাক বিক্রি নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছিলেন শিখ ধর্মীয় সংগঠনগুলি। সরকারের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, এই এলাকাগুলিতে ই-রিকশা পরিষেবা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ভক্তদের সুবিধা বাড়ানোর দিকেও জোর দেওয়া হচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রশংসা ও কটাক্ষ

এই সিদ্ধান্তের পর স্বর্ণমন্দিরের সূর্যাস্ত ও রাতের ছবিতে ভরে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। শান্ত, আধ্যাত্মিক পরিবেশের সেই ছবিগুলি ভাইরাল হয়ে কয়েক হাজার লাইক ও শতাধিক মন্তব্য পেয়েছে। অনেকেই এই সিদ্ধান্তকে “শিখ মূল্যবোধ রক্ষার সাহসী পদক্ষেপ” বলে প্রশংসা করেছেন। আবার অন্যদিকে কটাক্ষও কম নয়। একাংশের প্রশ্ন—“দোকানে মদ বন্ধ হলে কী মেথ বা অন্যান্য মাদক বন্ধ হবে?” পাঞ্জাব দীর্ঘদিন ধরেই মাদক সমস্যায় জর্জরিত, যা নিয়ে বিরোধীরা সরকারের দ্বিচারিতা নিয়ে আক্রমণ শানিয়েছেন।

অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ

সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ছোট দোকানদার, মাংস বিক্রেতা ও পানশালার মালিকদের অভিযোগ, কোনও স্পষ্ট বিকল্প বা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই হঠাৎ এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ায় তাঁদের রুজি-রোজগারে বড় ধাক্কা লাগবে। এখনও পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞায় কোনও নির্দিষ্ট ছাড় বা ব্যতিক্রমের কথা ঘোষণা করা হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যতটা সহজ, বাস্তবে তা কার্যকর করা ততটাই কঠিন। জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষা (NFHS-5) অনুযায়ী, পাঞ্জাব দেশের উচ্চ মদ্যপান প্রবণতাসম্পন্ন রাজ্যগুলির মধ্যে অন্যতম। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এই নিষেধাজ্ঞা কি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে, নাকি সীমিত সময়ের জন্য প্রতীকী পদক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে?

রাজনৈতিক বার্তা স্পষ্ট

এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে আম আদমি পার্টি স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক বার্তাও দিতে চাইছে—ধর্মীয় সংবেদনশীলতা ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে তারা বিজেপির থেকে কোনও অংশে পিছিয়ে নেই। একই সঙ্গে, অবিজেপি শাসিত রাজ্য হয়েও ধর্মীয় মূল্যবোধকে সামনে রেখে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যে সম্ভব, সেটাই প্রমাণ করতে চাইছে পাঞ্জাব সরকার।

সব মিলিয়ে, মদ-মাংস-তামাক নিষেধাজ্ঞা পাঞ্জাবের রাজনীতিতে যেমন নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, তেমনই সামনে এনেছে এক বড় প্রশ্ন—ধর্মীয় পবিত্রতা আর সামাজিক বাস্তবতার মাঝের ভারসাম্য কতটা রক্ষা করা সম্ভব? আগামী দিনেই মিলবে তার উত্তর।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন