প্রয়াগরাজ (Prayagraj) আবারও উত্তপ্ত। অভিযোগ— টাকা, চাকরি ও আর্থিক টোপ দেখিয়ে ধর্মান্তরের চেষ্টা! ঘটনাস্থল, ফার্স্ট অ্যাসেম্বলি অফ গড চার্চ। অভিযুক্ত পাদরি পিটার রাজু। শুক্রবার সন্ধ্যায় এই চার্চেই হঠাৎ হাজির হন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) বেশ কয়েকজন কর্মী। এরপর যা ঘটে, তার ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই বিশাল বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে— চার্চের ভেতরে অনুমতি ছাড়া ‘বিশেষ প্রার্থনা সভা’-র আড়ালে দরিদ্র পরিবারগুলিকে ধর্মান্তরের দিকে প্রলুব্ধ করা হচ্ছিল। ভিএইচপি-র দাবি, অংশগ্রহণকারীদের চাকরির নিশ্চয়তা, মাসিক অনুদান এবং বিভিন্ন সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেখিয়েই তাঁদের ধর্মান্তর করতে চাইছিলেন পাদরি পিটার রাজু।
ভিএইচপি-র ‘অভিযান’, চার্চে হাহাকার
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৫০–৬০ জনের একটি ভিড় ছিল চার্চে— এর মধ্যে বহু পরিবার, বয়স্ক মহিলা ও শিশুও ছিল। ভিএইচপি কর্মীরা হঠাৎ ঢুকে পাদরির বিরুদ্ধে ‘ধর্মান্তর চক্র’ চালানোর অভিযোগ আনতেই পরিস্থিতি উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কয়েকজন কর্মী পাদরিকে ঘিরে ধরে কঠোর ভাষায় জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বাইরে থেকে আরও লোক জড়ো হতে থাকলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ঘটনাস্থলে থাকা ভিডিওতে দেখা গেছে, কিছু কর্মী পাদরিকে দায়ী করে স্লোগান দিচ্ছেন, অন্যদিকে চার্চের সদস্যরা আতঙ্কে চারদিকে ছুটছেন। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ক্লিপে ‘শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব’— এমন হুমকিমূলক মন্তব্যও শোনা গিয়েছে।
পুলিশ এসে ভিড় সরাল, কিন্তু FIR নেই
তীব্র উত্তেজনার খবর পেয়ে প্রয়াগরাজ পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। পুলিশ ভিড় সরিয়ে চার্চ খালি করিয়ে দেয়। তবে অবাক করার মতো বিষয়— এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই FIR দায়ের করেনি।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ‘‘ঘটনাস্থলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। কোনও গ্রেফতার হয়নি। অভিযোগ লিখিতভাবে পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’
এতেই ক্ষুব্ধ ভিএইচপি নেতারা। তাঁদের হুঁশিয়ারি— অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা না হলে জেলাময় আন্দোলন করা হবে।
উত্তরপ্রদেশের ধর্মান্তর আইন: অভিযোগ কতটা সত্য, কতটা রাজনীতি?
২০২০ সালে উত্তরপ্রদেশ সরকার ‘বেআইনি ধর্মান্তর নিষেধাজ্ঞা আইন’ চালু করে, যেখানে প্রলোভন, প্রতারণা বা জোর করে ধর্মান্তর করালে শাস্তির বিধান রয়েছে। এরপর থেকেই বহু এলাকায় খ্রিস্টান গির্জা ও প্রার্থনা সভাকে কেন্দ্র করে অভিযোগ-বিতর্ক লেগে থাকে।
তবে এভানজেলিকাল ফেলোশিপ অফ ইন্ডিয়া (EFI)-র রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে— ২০২৩–২৪ সালে ধর্মান্তর অভিযোগে হওয়া ৫০০-র বেশি গ্রেফতারের বেশিরভাগই ছিল প্রমাণহীন, বহু ক্ষেত্রে অভিযোগকারীরাই লিখিতভাবে জানান যে অভিযোগ ভুলবশত বা চাপের মুখে করা হয়েছিল।
বর্তমান ঘটনাতেও সেরকম নানা প্রশ্ন উঠছে—
- সত্যিই কি চাকরি বা টাকার টোপ দেওয়া হয়েছিল?
- নাকি গুজব ছড়িয়ে উত্তেজনা বাড়ানো হয়েছিল?
- চার্চে আসা পরিবারগুলির আসল উদ্দেশ্য কী ছিল?
- যেহেতু FIR না থাকায় তদন্ত শুরু হয়নি, তাই সত্যতা যাচাই করা কঠিন।
চার্চের দাবি— নিয়মিত প্রার্থনা সভা, ধর্মান্তরের প্রশ্নই নেই
চার্চ প্রশাসনের তরফে অনানুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া— ‘‘এটি সাধারণ প্রার্থনা সভা ছিল। কেউ কাউকে ধর্মান্তর করার চেষ্টা করেনি। ভিএইচপি-এর অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’’ তাঁদের মতে, দুঃস্থ পরিবারদের মাঝে খাবার ও জামাকাপড় বিলি করাকে ‘‘ধর্মান্তর চেষ্টা’’ বলে দেখানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক তাপমাত্রা বাড়তে পারে
উত্তরপ্রদেশে ভোটের আগে ধর্মান্তর বিষয়টি বারবার রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসছে। BJP-র একাংশ ইতিমধ্যেই দাবি করেছে— ‘‘রাজ্যে খ্রিস্টান মিশনারি কার্যকলাপ বাড়ছে, সরকারকে আরও কড়া হতে হবে।’’ অন্যদিকে বিরোধী দলগুলির বক্তব্য— ‘‘ধর্মীয় মনোভাব উস্কে দিয়ে মূল সমস্যা থেকে মন ঘোরানো হচ্ছে।’’
Ruckus in Prayagraj, UP, over reports of religious conversion programme.
As per VHP activists, Pastor Peter Raju was running conversion event by luring people with jobs and money.
Police reached spot, stopped the prayer meeting for lack of permission, warned Peter Raju.… pic.twitter.com/HNvV1hggOA
— Treeni (@TheTreeni) November 30, 2025
একই সতর্কবার্তা— আইন হোক বা বিশ্বাস, ভিড়তন্ত্র বিপজ্জনক
এ ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক— অভিযোগ প্রমাণের আগেই গেরুয়া দলের কিছু কর্মীর ‘শিক্ষা’ দেওয়ার মানসিকতা। আইনজীবীদের মতে, ‘‘ধর্মান্তর-নিষেধাজ্ঞা আইন থাকলেও তার প্রয়োগ আদালত করবে, কোনও রাজনৈতিক সংগঠন নয়।’’
প্রয়াগরাজের এই নতুন ঘটনা দেখিয়ে দিল— ধর্ম, রাজনীতি ও গুজব— তিনের মিশ্রণে উত্তরপ্রদেশে উত্তেজনা যে কোনও মুহূর্তে তীব্র হয়ে উঠতে পারে। পুলিশ কী পদক্ষেপ নেবে, ভিএইচপি কি আন্দোলনে নামবে— সেই দিকেই এখন নজর সাধারণ মানুষের।
