দলের নেতাদের চুরি ফাঁস করলেন তৃণমূল বিধায়ক!

tmc-mla-manoranjan-byapari-exposes-corruption-bolagarh

বলাগড়ে একই মাঠে পরপর বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের সভা হলেও (TMC MLA Manoranjan Byapari)সেখানে আমন্ত্রণ না পাওয়া নিয়ে শুরু হওয়া জল্পনার মাঝেই কার্যত দলের অন্দরেই বিস্ফোরণ ঘটালেন তৃণমূল বিধায়ক মনোরঞ্জন ব্যাপারি। নিজের ফেসবুক পোস্টে তিনি সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন—এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের দুর্নীতি, চুরি, পাচার ও বেআইনি কারবারে বাধা দেওয়াতেই তাঁকে ইচ্ছে করে দলীয় কর্মসূচি থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

মনোরঞ্জন ব্যাপারি লেখেন, অনেকদিন ভেবেছিলেন এই কথা প্রকাশ্যে আনবেন না। কিন্তু ক্রমাগত প্রশ্ন ও জ্বালাতনে আর চুপ থাকা সম্ভব হয়নি। বলাগড়ে একই মাঠে বিজেপি ও তৃণমূলের সভা হওয়া সত্ত্বেও একজন বর্তমান বিধায়ক হিসেবে তাঁকে কেন ডাকা হল না—এই প্রশ্নের জবাব দিতেই তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন।

   

ড্রোন বাহিনীর সম্প্রসারণ! ৮৫০টি দেশীয় কামিকাজে ড্রোন কিনেছে ভারতীয় সেনা

তিনি স্পষ্ট করেন, বিজেপির সভায় তাঁকে না ডাকা স্বাভাবিক এবং ডাকলেও তিনি যেতেন না। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে তৃণমূলের সভা নিয়ে। সেখানেই তাঁর বিস্ফোরক বক্তব্য—গত সাড়ে চার বছরে বলাগড়ে তিনি যে কাজগুলো করেছেন, তা এলাকার অনেক নেতার কাছেই “সুখকর” নয়।

বিধায়কের দাবি, সরকারের তরফে পাওয়া ত্রিপল, কম্বল, কাপড়-চোপড় তিনি কোনোদিনই আঞ্চলিক নেতাদের হাতে তুলে দেননি। নিজে ঘুরে ঘুরে দরিদ্র মানুষের মধ্যে সেই সব সামগ্রী বিতরণ করেছেন। তাঁর কথায়, “নেতাদের কাছে ৫০টা দিলে ৪০টা নিজের জন্য রেখে ১০টা বিলি করার যে পুরনো সুখ, সেই আনন্দ থেকে আমি ওদের বঞ্চিত করেছি।” এই কাজটাই নাকি তাঁর “অপরাধ”।

শুধু ত্রাণ বিলিই নয়, অবৈধ মাটি উত্তোলন ও বালি পাচারের বিরুদ্ধেও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন মনোরঞ্জন ব্যাপারি। তিনি লেখেন, বছরের পর বছর আগে মাটির রাজস্ব বাবদ সরকারের কোষাগারে যেখানে ২০–২৫ লক্ষ টাকার বেশি জমা পড়ত না, তাঁর চেষ্টায় সেই অঙ্ক বেড়ে হয়েছিল ১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। যে টাকা আগে নেতাদের পকেটে যেত, সেটাই সরকারকে দিতে বাধ্য করায় বহু “তাবড় তাবড়” নেতা তাঁর উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।

গুপ্তিপাড়ায় বালি পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানকে তিনি “ইতিহাস” বলে উল্লেখ করেন। আজও নাকি ঘাট এলাকার বহু মানুষ সেই সময়কার ঘটনার কথা ভুলতে পারেননি। পাশাপাশি গরু পাচার, গাঁজা পাচার, রেশনের মাল পাচার, জুয়ার বোর্ড—সব কিছুর বিরুদ্ধেই তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন বলে দাবি করেন বিধায়ক। সবুজদ্বীপ থেকে রাতের অন্ধকারে বড় বড় গাছ কেটে পাচার রুখে দেওয়ার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

এই সমস্ত পদক্ষেপে যাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের পরিচয় বলাগড়ের মানুষ জানেন বলেই দাবি মনোরঞ্জন ব্যাপারির। তাঁর বক্তব্য, সেই লোকজনই আজ বিভিন্ন সভা-সমাবেশের আয়োজক। তিনি মঞ্চে উঠলে মুখে তালা নেই—সরাসরি সব কথা বলে দেবেন। তাতেই তারা বিড়ম্বনায় পড়বেন। সেই কারণেই ইদানীং তাঁকে আর কোনো সভায় ডাকা হয় না।

পোস্টের শেষ অংশে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও স্পষ্ট অবস্থান নেন মনোরঞ্জন ব্যাপারি। তিনি নিজেকে “অতি তুচ্ছ মানুষ” বলে উল্লেখ করে লেখেন, বিধায়ক হওয়ার মতো যোগ্যতা তাঁর ছিল না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন, তিনি তা সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন—দীর্ঘ জীবনের সুনামের গায়ে একটিও কালির দাগ লাগতে দেননি বলেই তাঁর দাবি। সামনে আর কয়েকটা দিন বাকি—এই ক’টা দিন শান্তিতেই কাটাতে চান তিনি।

পরের বারের টিকিট পাবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর কোনো দুঃখ বা আক্ষেপ নেই বলে সাফ জানিয়েছেন মনোরঞ্জন ব্যাপারি। তাঁর কথায়, রাজনীতি তাঁর কাছে চাকরি বা ব্যবসা নয়। বিধায়ক না থাকলেও জনসেবা করার বহু প্ল্যাটফর্ম তাঁর হাতে আছে।

সবশেষে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন—এই বিষয়ে তিনি আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চান না। কিন্তু তাঁর এই ফেসবুক পোস্ট ঘিরে তৃণমূলের অন্দরেই যে নতুন বিতর্ক ও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা যে আরও বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন