গুয়াহাটি: অসমের রাজনৈতিক-সামাজিক মহলে আজকাল একটা নতুন আলোয় ঝলক দিচ্ছে অপারেশন টর্চ (Operation Torch)। পুলিশের একটি ব্যাপক যাচাই অভিযানে প্রায় ৫০০ জন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এরা অসম বা বাংলার বাসিন্দা বলে দাবি করলেও, তাদের কাছে কোনো বৈধ নথি-পত্র নেই।
এই অভিযানটি কেবল যাচাইয়ের নামে শুরু হয়নি, বরং এর পেছনে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা এবং নির্বাচনী তালিকার সততা রক্ষার লক্ষ্য। অ্যাকশন এখনও চলছে যাচাই, গ্রেফতার এবং সম্ভাব্য প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া জোরকদমে এগোচ্ছে। এই ঘটনা অসমের স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তির সঙ্গে মিশ্রিত উদ্বেগ জাগিয়েছে।
Brixton Storr 500-এর ভারতে লঞ্চ পিছিয়ে গেল, কবে আসবে দেখুন
অপারেশন টর্চের সূচনা হয়েছে গত মাসের শেষভাগে, যখন অসম পুলিশ কেন্দ্রীয় নির্দেশনার ভিত্তিতে স্লাম এলাকা, শহুরে বস্তি এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে গোপনীয়তা ভেদ করে অভিযান শুরু করে। গুয়াহাটি, ডিব্রুগড়, সিলচার এবং নাগাঁওয়ের মতো জেলাগুলোতে বিশেষ দল গঠন করা হয়েছে, যারা ঘরে ঘরে গিয়ে পরিচয়পত্র, আধার কার্ড, ভোটার আইডি এবং রেসিডেন্স প্রুফ যাচাই করছে। প্রথম ধাপেই ৫০০-এর বেশি ব্যক্তির সন্দেহজনক পরিচয় উঠে এসেছে।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এদের মধ্যে ২৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী বলে মনে হচ্ছে, যারা সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছে। আরও ১৫০ জন রোহিঙ্গা, যারা মিয়ানমারের সংকট থেকে পালিয়ে এসেছে কিন্তু কোনো আইনি স্বীকৃতি পায়নি। বাকিরা আসামের বারপেটা বা বাংলার মুর্শিদাবাদের মতো জেলা থেকে বলে দাবি করছে, কিন্তু তাদের নথিগুলো জাল বা অসম্পূর্ণ।
একজন পুলিশ অফিসার বলছেন, “এরা ভোটার তালিকায় নাম ভর্তি করে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। আমরা এখন ফরেনার্স অ্যাক্ট ১৯৪৬-এর অধীনে ব্যবস্থা নিচ্ছি।”এই অভিযানের পটভূমি আরও গভীর। সাম্প্রতিককালে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবৈধ অভিবাসন বেড়েছে, বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে।
অসমে এমনকি জাতীয় নাগরিক রেজিস্টার (এনআরসি)-এর পরেও হাজার হাজার সন্দেহভাজনের নাম ছিল, যা এখনও সম্পূর্ণ মেটেনি। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) প্রক্রিয়া চলাকালীন এই অপারেশনের গতি বেড়েছে, কারণ অনেক অবৈধ অভিবাসী ভোটার তালিকায় নাম লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। কেন্দ্রীয় গৃহ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে এই অভিযান চালানো হচ্ছে, যাতে শুধু অসম নয়, উত্তরপ্রদেশ, গুরুগ্রাম এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলোতেও একই ধরনের ড্রাইভ চলছে।
গুরুগ্রামে সম্প্রতি ২৫০ জনকে আটকে ১০ জনকে বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেছেন, “এটা আমাদের সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা রক্ষার লড়াই। অবৈধ অভিবাসীরা আমাদের সম্পদ লুটছে, এবার আর চলবে না।”স্থানীয়দের মধ্যে এই অভিযান নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। গুয়াহাটির এক বাসিন্দা বলছেন, “আমরা বছরের পর বছর এই ভয়ে বাঁচি যে অবৈধরা আমাদের চাকরি, জমি কেড়ে নেবে।
এই টর্চের আলো আমাদের স্বস্তি দিচ্ছে।” কিন্তু অনেকে উদ্বিগ্ন যাতে স্থানীয় বাঙালি বা মুসলিমদের হয়রানি না হয়। বিরোধী দল কংগ্রেস এবং এআইউডিএফ এটাকে ‘রাজনৈতিক স্বার্থে চালানো অভিযান’ বলে অভিযোগ করেছে। কংগ্রেস নেতা গৌরব গোগোই বলেছেন, “এটা এনআরসি-এর পুনরাবৃত্তি, যা হাজারো নির্দোষকে কষ্ট দিয়েছে।
যাচাই হোক, কিন্তু মানবাধিকার লঙ্ঘন করা চলবে না।” মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সতর্ক করে বলেছে, রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। ইউএনএইচসিআর-এর রিপোর্ট অনুসারে, ভারতে ৪০,০০০-এর বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে, যাদের মধ্যে অনেকেরই আইনি স্থিতি অস্পষ্ট।
